ঢাকা | ফেব্রুয়ারী ২৬, ২০২৬ - ৩:১৮ অপরাহ্ন

সুনীল অর্থনীতি ও পর্যটনের সমন্বয়ে সাতক্ষীরা উপকূলের উন্নয়নের রূপরেখা

  • আপডেট: Thursday, February 26, 2026 - 1:11 pm

পল্লব ঘোষ।। বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলের প্রবেশদ্বার সাতক্ষীরা জেলা যার ভৌগোলিক অবস্থান একে নীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমির এক বিশাল চারণভূমিতে পরিণত করেছে। নীল অর্থনীতি মূলত সমুদ্রের জলরাশি এবং এর তলদেশের সম্পদকে টেকসইভাবে ব্যবহারের এক আধুনিক অর্থনৈতিক ধারণা আর সাতক্ষীরার ক্ষেত্রে এই ধারণার সাথে পর্যটন শিল্পের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। কারণ এই অঞ্চলের পর্যটন পুরোপুরি নির্ভর করে সুন্দরবন এবং এর কোলঘেঁষে বয়ে যাওয়া নদী ও সমুদ্রের মোহনার ওপর। সাতক্ষীরাকে এই নতুন অর্থনৈতিক ধারায় সমৃদ্ধ করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন সমুদ্র সম্পদ এবং পর্যটনকে একটি একক উন্নয়ন কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসা। নীল অর্থনীতির অংশ হিসেবে যখন উপকূলীয় নদীগুলোতে উন্নত মৎস্য চাষ বা কাঁকড়া উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে তখন সেটি কেন্দ্র করে কৃষি পর্যটন বা এগ্রো ট্যুরিজমের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। পর্যটকরা যখন সাতক্ষীরায় আসবেন তখন তারা কেবল বন দেখবেন না বরং সমুদ্রের নীল জলরাশি থেকে আহরিত টাটকা সামুদ্রিক খাবার এবং উপকূলীয় মানুষের জীবনধারা উপভোগ করবেন যা পর্যটন খাতের আয়কে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

সাতক্ষীরায় ব্লু ইকোনমি ও পর্যটনের সমন্বিত উন্নয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত এবং সুন্দরবনের গহিন অঞ্চলগুলোতে পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বর্তমানে এসব অঞ্চলে পৌঁছানো পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য এবং ব্যয়বহুল। এই সমস্যার সমাধানে শ্যামনগর থেকে মালঞ্চ বা রায়মঙ্গল নদী হয়ে আধুনিক ও নিরাপদ ওয়াটার ট্যাক্সি বা বিলাসবহুল ক্রুজ শিপ চালু করা যেতে পারে যা পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা হবে এবং একই সাথে নদীভিত্তিক নীল অর্থনীতির কর্মসংস্থান তৈরি করবে। এছাড়া সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে সামুদ্রিক শৈবাল বা সি উইড চাষের সম্ভাবনা রয়েছে যা ব্লু ইকোনমির একটি প্রধান অংশ। এই শৈবাল চাষের খামারগুলোকে পর্যটন আকর্ষণে রূপান্তর করা সম্ভব যেখানে পর্যটকরা সামুদ্রিক সম্পদ উৎপাদনের প্রক্রিয়া সরাসরি দেখতে পারবেন। পর্যটনকে শক্তিশালী করতে হলে সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জ বা নীলডুমুর এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের ফ্লোটিং রিসোর্ট বা ভাসমান হোটেল নির্মাণ করা প্রয়োজন যা বিশ্বের অনেক উন্নত পর্যটন দেশে দেখা যায়। এটি সাতক্ষীরার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে নষ্ট না করেই পর্যটকদের আকৃষ্ট করার একটি টেকসই পদ্ধতি হতে পারে।

ব্লু ইকোনমির মাধ্যমে সাতক্ষীরার উন্নয়নের জন্য সমুদ্রের লোনা পানিকে অভিশাপ না ভেবে সম্পদে রূপান্তর করার বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। উপকূলীয় এলাকায় আধুনিক লবণ পরিশোধন কেন্দ্র এবং সমুদ্রের মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুলতে পারলে স্থানীয় অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত হবে। পর্যটনের প্রসারে স্থানীয় বাওয়ালি মৌয়াল এবং মুন্ডা সম্প্রদায়ের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার জন্য একটি স্থায়ী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বা হেরিটেজ ভিলেজ স্থাপন করা জরুরি। এতে করে পর্যটকরা শুধু শীতকালে নয় বরং সারা বছরই সাতক্ষীরা ভ্রমণে আগ্রহী হবেন। অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে উপকূলীয় অঞ্চলে শক্তিশালী ও প্রশস্ত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা অপরিহার্য কারণ এই বাঁধগুলো একদিকে যেমন দুর্যোগ থেকে সম্পদ রক্ষা করবে অন্যদিকে এই বাঁধের ওপর দিয়ে নির্মিত রাস্তা পর্যটকদের জন্য ড্রাইভওয়ে হিসেবে কাজ করবে। সাতক্ষীরার নীল অর্থনীতির সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা আধুনিক লঞ্চ রিসোর্ট এবং মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারে।

পরিশেষে সাতক্ষীরা উপকূলের উন্নয়ন মানেই হলো সমুদ্র ও বনের সাথে মানুষের এক ভারসাম্যপূর্ণ সহাবস্থান তৈরি করা। ব্লু ইকোনমি এবং পর্যটনের এই মেলবন্ধন যদি সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যায় তবে সাতক্ষীরা হবে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ইকো ট্যুরিজম জোন। এর ফলে একদিকে যেমন সমুদ্রের তলদেশ ও ওপরের সম্পদ ব্যবহার করে জাতীয় আয় বাড়বে অন্যদিকে পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের দারিদ্র্য বিমোচন হবে। সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান রক্ষা করে এবং পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সাতক্ষীরা উপকূল সারা দেশের জন্য উন্নয়নের একটি নতুন মডেল হয়ে দাঁড়াবে। নীল জলরাশি আর সবুজের এই সমারোহকে কাজে লাগিয়ে সাতক্ষীরাকে একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন ও অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তোলাই এখন সময়ের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

লেখক: জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।