ঢাকা | ফেব্রুয়ারী ২৮, ২০২৬ - ১১:১৪ অপরাহ্ন

শিরোনাম

সাতক্ষীরা পলিটেকনিক: পর্যটন শিক্ষায় নতুন বিপ্লব

  • আপডেট: Saturday, February 28, 2026 - 9:44 pm

পল্লব ঘোষ।। বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতিতে পর্যটন শিক্ষা কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নয় বরং এটি তরুণ প্রজন্মের জীবনধারা আমূল বদলে দেওয়ার এক শক্তিশালী চাবিকাঠি। বিশ্বায়ন ও আধুনিকায়নের এই যুগে পর্যটন ও আতিথেয়তা খাত বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃত।

 

আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের প্রতি দশটি কর্মসংস্থানের একটি আসে পর্যটন খাত থেকে এবং ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের তথ্যমতে বৈশ্বিক জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ।

থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো তাদের তরুণ প্রজন্মকে পর্যটন ও সেবা খাতে দক্ষ করে গড়ে তোলার মাধ্যমেই আজ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির শীর্ষে অবস্থান করছে। বিশেষ করে সুইজারল্যান্ডের মতো দেশগুলো তাদের কারিগরি শিক্ষায় আতিথেয়তাকে এমনভাবে যুক্ত করেছে যে সেখানকার তরুণরা আজ বিশ্বের দামী চেইন হোটেল ও পর্যটন সংস্থাগুলোতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই চিত্রের প্রতিফলন ঘটা সম্ভব। কারণ বর্তমানে আমাদের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান প্রায় ৩ শতাংশ এবং সঠিক প্রশিক্ষণ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে এই আয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ সরাসরি এই খাতে নিয়োজিত থাকলেও দক্ষ ও শিক্ষিত জনশক্তির অভাব প্রকট।

এই শূন্যতা পূরণে সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগটি এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছে যা এই অঞ্চলের তরুণদের গতানুগতিক ক্যারিয়ার ভাবনার বাইরে এসে আন্তর্জাতিক মানের পেশাদার হিসেবে গড়ে তুলছে।

সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে পর্যটন ও আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনায় শিক্ষা গ্রহণ করার পর এই অঞ্চলের তরুণ প্রজন্মের সামনে ভবিষ্যতের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ উন্মোচিত হবে।

সাতক্ষীরা যেহেতু বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের প্রধান প্রবেশদ্বার এবং এখানে সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ি ঘের ও আদি সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন রয়েছে তাই এখানকার শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষে সরাসরি স্থানীয় সম্পদকে কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা হতে পারবে। ভবিষ্যতে এই তরুণরা সুন্দরবনের নদীগুলোতে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ভাসমান রিসোর্ট বা হাউসবোট পরিচালনার মাধ্যমে পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারবে যা আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণ করার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হবে।

এছাড়া সাতক্ষীরার বিখ্যাত খাঁটি মধু, গোলপাতা এবং হস্তশিল্পকে কেন্দ্র করে তারা সুবেনির ট্যুরিজম ব্র্যান্ডিং করতে পারবে যা স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির জ্ঞান কাজে লাগিয়ে এই তরুণরা ড্রোন ফটোগ্রাফি বা ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে সুন্দরবনের গহীন অরণ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার মতো উদ্ভাবনী সেবা প্রদান করতে পারবে। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত এই তরুণরা কেবল দেশের ভেতরে ফাইভ স্টার হোটেল বা রিসোর্টে কাজ করার সুযোগ পাবে না বরং মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের শ্রমবাজারেও দক্ষ জনশক্তি হিসেবে উচ্চ বেতনে নিয়োগ পাবে যা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে নতুন গতি আনবে।

পর্যটন শিক্ষা গ্রহণের ফলে সাতক্ষীরার তরুণদের জীবনযাত্রায় আসবে এক বৈপ্লবিক আধুনিকতা কারণ এই শিক্ষা তাদের মধ্যে উন্নত যোগাযোগ দক্ষতা, একাধিক ভাষা শেখার আগ্রহ এবং বিশ্বজনীন শিষ্টাচার গড়ে তোলে। তারা আর কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেরাই কমিউনিটি বেজড ইকো ট্যুরিজম এর মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে যেখানে বিদেশি পর্যটকরা এসে গ্রামীণ জীবন ও কৃষিকাজের স্বাদ নিতে পারবে। সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম যেমন কায়াকিং বা ফরেস্ট ট্র্যাকিং গাইড হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে তারা একদিকে যেমন রোমাঞ্চকর জীবন উপভোগ করবে অন্যদিকে অর্থ উপার্জনের এক টেকসই উৎস খুঁজে পাবে। মূলত পর্যটন শিক্ষা সাতক্ষীরার তরুণদের সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে বের করে একজন আত্মবিশ্বাসী বিশ্বনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে যারা তাদের উদ্ভাবনী মেধা দিয়ে বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রকে বিশ্বের বুকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। এই শিক্ষার মাধ্যমেই জীবনযাত্রায় আসবে স্থিতিশীলতা এবং কর্মজীবনে আসবে আন্তর্জাতিক সম্মান যা শেষ পর্যন্ত একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

লেখক: জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।