ঢাকা | এপ্রিল ২, ২০২৬ - ২:০৯ অপরাহ্ন

শিরোনাম

সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া সেই সোনাঝরা দিনগুলো

  • আপডেট: Thursday, April 2, 2026 - 12:37 pm

সহাদেব দাশ।। সময় বহমান, আর এই সময়ের নিষ্ঠুর পরিহাসে সবচাইতে বেশি বদলে গেছে আমাদের শৈশবের রঙ। ২০০০ সালের সেই ধূলামাখা শৈশব আর ২০২৬ সালের এই চার দেয়ালের প্রযুক্তিনির্ভর শৈশবের মাঝে আকাশ-পাতাল তফাৎ। এই পার্থক্য শুধু জীবনযাপনের নয়, বরং এ যেন এক পলিমাটি মাখা আবেগের সাথে যান্ত্রিক শীতলতার বিচ্ছেদ।

মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা? যখন বিকেল মানেই ছিল পাড়া-মহল্লার অবারিত মাঠে একঝাঁক শিশুর কোলাহল। গোল্লাছুট, কানামাছি, দাড়িয়াবান্ধা কিংবা লুকোচুরি খেলায় মেতে থাকা সেই দিনগুলো ছিল প্রাণের স্পন্দনে ভরপুর। রোদে পুড়ে তামাটে হওয়া শরীরে ফুটবল কিংবা ক্রিকেটের উন্মাদনা আমাদের শিখিয়েছিল দলবদ্ধ থাকার আনন্দ। অথচ আজকের প্রেক্ষাপটে শৈশব যেন ঘরের কোণে এক মুঠো স্ক্রিনে বন্দি। খোলা মাঠের পরিবর্তে এখন শিশুদের অবসরের সঙ্গী হয়েছে মোবাইল গেম, ইউটিউবের ঝলকানি আর অনলাইন দুনিয়ার কৃত্রিম ব্যস্ততা।

সেই সময়ে আমাদের বন্ধুত্বগুলো গড়ে উঠত প্রতিদিনের দুষ্টুমি, একসঙ্গে স্কুল পালানো আর বিকেলে একসাথে হাত ধরাধরি করে হাঁটার মধ্য দিয়ে। মাটির গন্ধ মাখা সেই বন্ধুত্বে ছিল প্রাণের টান। কিন্তু আজকের দিনে অধিকাংশ বন্ধুত্বই গড়ে ওঠে সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা অনলাইন গেমের চ্যাট বক্সে। বাস্তবের সেই প্রানবন্ত আড্ডাগুলো আজ যান্ত্রিকতায় ফিকে হয়ে গেছে।

শৈশবের আনন্দগুলো ছিল কত সাধারণ, অথচ কত গভীর! ঘুড়ি ওড়ানো, প্রথম বৃষ্টির ফোঁটায় ভিজে একাকার হওয়া, নর্দমার জলে কাগজের নৌকা ভাসানো কিংবা গ্রামের মেলায় মাটির পুতুল কেনা এসবেই ছিল আমাদের স্বর্গীয় সুখ। আজ বিনোদনের সংজ্ঞাটাই পাল্টে গেছে। এখন আনন্দ মানেই ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি আসক্তি। তখনকার সন্ধ্যায় পরিবারের সবাই মিলে একসাথে বসে গল্পের ঝুড়ি খোলা কিংবা টেলিভিশনে বিটিভির নাটক দেখার যে নিবিড় পরিবেশ ছিল, তা এখন পড়াশোনার চাপ, কোচিং আর অনলাইন ক্লাসের ব্যস্ততায় বিলীন হয়ে গেছে।

নদী, বিশাল মাঠ আর খোলা আকাশের নিচে বেড়ে ওঠা সেই দিনগুলো এখন স্মৃতি মাত্র। বর্তমানের শিশুরা বেড়ে উঠছে শহরের উঁচু দালানের খাঁচায়, যেখানে খেলার জায়গা বলতে হয়তো ছোট্ট এক টুকরো বারান্দা। ২০০০ সালের শৈশব ছিল এক বুক অপেক্ষা আর কৌতূহলে ঘেরা বাস্তব অভিজ্ঞতার গল্প। আর ২০২৬ সালের শৈশব প্রযুক্তির সবটুকু সুবিধা পেলেও কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছে সেই সরলতা আর মাটির সোঁদা গন্ধ।

প্রযুক্তি হয়তো আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে শৈশবের সেই নির্মল প্রশান্তি। আমাদের শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য আজ তাই বড্ড প্রয়োজন সেই পুরনো প্রকৃতিকে ফিরিয়ে আনা। প্রযুক্তির ভিড়ে যেন হারিয়ে না যায় খোলা মাঠের দৌড়ঝাঁপ আর মানবিক সম্পর্কের সেই গভীর টান।

লেখক: সহাদেব দাশ, পরিচালক, এম এস কম্পিউটার তালা, সাতক্ষীরা।