ঢাকা | মার্চ ১৬, ২০২৬ - ৯:৫৫ অপরাহ্ন

শিরোনাম

শক্তির দম্ভে ফিকে হওয়া সার্বভৌমত্ব: ২০২৬-এর ইরান সংকট ও বাস্তববাদের শাসন

  • আপডেট: Monday, March 16, 2026 - 8:10 pm

মামুন হাসান।। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যে আগুনের গোলক আছড়ে পড়েছে, তা কেবল তেহরানের কোনো সামরিক স্থাপনায় আঘাত নয়, বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর গত আট দশকের স্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থার ওপর এক মরণঘাতী আঘাত। ১৯৪৫ সালে নাৎসি বাহিনীর পরাজয়ের পর যখন আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল, তখন দুনিয়া এক শান্তিময় এবং সুশৃঙ্খল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল। সেই কাঠামোর মূল কারিগর ছিল খোদ যুক্তরাষ্ট্র। নুরেমবার্গ ট্রায়াল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের জন্ম পর্যন্ত আমেরিকার যে নেতৃত্ব ছিল, আজ ২০২৬ সালে এসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সামরিক সিদ্ধান্ত সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যের গায়ে কুঠারাঘাত করল। মধ্যপ্রাচ্যের এই চলমান যুদ্ধ প্রমাণ করছে যে, আন্তর্জাতিক আইন এখন আর সার্বভৌমত্বের ঢাল নয়, বরং শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর ইচ্ছাপূরণের হাতিয়ার মাত্র।

ঐতিহাসিকভাবে ১৯৪৫ পরবর্তী কয়েক দশকে একটি সাধারণ ধারণা প্রতিষ্ঠিত ছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র তার শত্রুপক্ষীয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার সময় অন্তত আন্তর্জাতিক আইনের প্রথাগত রীতিনীতিগুলো মেনে চলার ভান করত। যদিও সিআইএর গোপন অভিযানগুলো ছিল এর ব্যতিক্রম, তবুও প্রকাশ্য যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনি বৈধতা প্রমাণের এক ধরনের চেষ্টা থাকত। কিন্তু বর্তমান ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরাইলি হামলা সেই প্রথাকে সমূলে উপড়ে ফেলেছে। এই আইনি বিচ্যুতির বীজ মূলত ২০০৩ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় রোপিত হয়েছিল, যা এখন পূর্ণাঙ্গ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের বর্তমান উদ্বেগটি বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে এর সীমাবদ্ধতার দিকে। উনবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধকে বিরোধ মীমাংসার বৈধ উপায় মনে করা হলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা রাষ্ট্রগুলোকে সামরিক পদক্ষেপের ওপর বিধিনিষেধ আরোপে বাধ্য করে। সমকালীন বিশ্বব্যবস্থার প্রাণভোমরা হলো জাতিসংঘ সনদের ২(৪) ধারা, যা কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব বা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত করতে বলপ্রয়োগকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

জাতিসংঘ সনদ যুদ্ধকে কেবল দুটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বৈধতা দেয়। প্রথমটি হলো ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে ‘আত্মরক্ষার সহজাত অধিকার’, যা কেবল সরাসরি সশস্ত্র আক্রমণের শিকার হলে কার্যকর হয়। দ্বিতীয়টি হলো নিরাপত্তা পরিষদের ৪২ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য সামরিক পদক্ষেপ। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরাইলি আক্রমণ এই দুটি শর্তের একটিকেও স্পর্শ করে না। ওমানের মধ্যস্থতায় যখন একটি পরমাণু চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল এবং উভয় পক্ষ যখন একটি সমঝোতার খুব কাছে পৌঁছেছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে এই হামলা কূটনীতির কপালে কলঙ্ক তিলক এঁকে দিয়েছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, ওয়াশিংটন কূটনীতিকে প্রকৃত সমঝোতার পথ হিসেবে নয়, বরং সামরিক প্রস্তুতির একটি কৌশলগত আবরণ হিসেবে ব্যবহার করেছে।

এই অতর্কিত হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ অন্তত ৪০ জন শীর্ষ কর্মকর্তার মৃত্যু কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের চূড়ান্ত অবমাননা। ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা এবং শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো। তবে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কৌরোশ জিয়াবারি বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী উইলিয়াম কুয়ান্টের মতো বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই লক্ষ্য অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। বরং এটি আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের জন্য বুমেরাং হতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন মধ্যমেয়াদি নির্বাচনে ফায়দা হাসিলের একটি ভুল হিসাব থেকে এই আগ্রাসনের সূত্রপাত। মাদুরোকে অপসারণের ব্যর্থ চেষ্টা কিংবা গ্রিনল্যান্ড আক্রমণের মতো খামখেয়ালি সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় এই ইরান আক্রমণ ট্রাম্পের ভাবমূর্তিকে বিশ্বব্যাপী প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

যুদ্ধের বাস্তবতা এখন এক ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। ইরানের অভ্যন্তরে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সংবিধান অনুযায়ী তিন সদস্যের নেতৃত্ব পরিষদ গঠিত হয়েছে এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ আল উজমা সৈয়দ মুজতবা খামেনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি ইতিমধ্যে ওয়াশিংটনকে তিনটি কঠিন শর্ত দিয়েছেন যা পূরণ না হলে ১০ এপ্রিলের মধ্যে হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ইরান এখন নিজের নিরাপত্তার খাতিরে চীন ও রাশিয়ার সাথে যৌথ সামরিক ও কৌশলগত জোট গঠনের পথে হাঁটছে। ইরানি ভূখণ্ডে রাশিয়া ও চীনের সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা মার্কিন মর্যাদার জন্য এমন এক প্রত্যাঘাত, যা অতীতের সব ঘটনাকে ছাড়িয়ে গেছে।

আজকের এই সংকট কেবল একটি দেশের মানচিত্রের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই। গাজায় ইসরাইল যে মানবিক বিপর্যয় তৈরি করেছিল, তার প্রতিচ্ছবি এখন ইসরাইলি সেটেলারদের জীবনেও প্রতিফলিত হচ্ছে। ইতিহাসের পরিহাস হলো, গাজাবাসী যেভাবে উত্তর থেকে দক্ষিণে বাস্তুচ্যুত হয়েছে, আজ সেই একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে আক্রমণকারী পক্ষকেও। বিশ্ব আজ তেলের বাজার এবং জ্বালানি নিরাপত্তার অনিশ্চয়তায় থরথর করে কাঁপছে। যদি অবিলম্বে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতি গ্রহণ করতে ব্যর্থ হন এবং কূটনীতির পথে ফিরে না আসেন, তবে ২০২৬ সালের এই বসন্তকাল হয়তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রারম্ভিকা হিসেবে ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে। আন্তর্জাতিক আইনের মৃত্যুঘণ্টা বেজে গেছে, এখন দেখার বিষয় বিশ্ব এই আইনহীন বলয় থেকে রক্ষা পায় নাকি এক নতুন অন্ধকার যুগে প্রবেশ করে।

লেখক: মো: মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।