ঢাকা | মার্চ ২৯, ২০২৬ - ৩:১০ অপরাহ্ন

শিরোনাম

মাত্র ৫০০ টাকার ভাড়া নিয়ে বিরোধে চিকিৎসা না পেয়ে প্রাণ গেলো নবজাতকের

  • আপডেট: Sunday, March 29, 2026 - 1:27 pm

কিশোরগঞ্জ সংবাদদাতা।। মাত্র ৫০০ টাকার ভাড়া নিয়ে বিরোধ—আর সেই জটিলতায় সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে প্রাণ হারাল এক নবজাতক। কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় ও ভাড়া নিয়ে দীর্ঘ তর্ক-বিতর্কের জেরে এই হৃদয়বিদারক ঘটনার জন্ম হয়েছে বলে অভিযোগ স্বজনদের।

শুক্রবার (২৭ মার্চ) দিবাগত রাতে কিশোরগঞ্জে এ ঘটনা ঘটে। শনিবার সকালে খবর ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতাল এলাকায় স্বজনদের কান্না, ক্ষোভ ও বিক্ষোভে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত অ্যাম্বুলেন্স চালক পালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে।

নিহত নবজাতক কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের মীরপাড়া গ্রামের মো. রোহানের সন্তান। পরিবার সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার রাত ১১টার দিকে শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে শিশুটির জন্ম হয়। জন্মের পরপরই শ্বাসকষ্ট ও ঠাণ্ডাজনিত জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত তাকে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

রাত সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দ্রুত তাকে ময়মনসিংহে রেফার করেন। কিন্তু সেখানেই শুরু হয় বিপত্তি।

পরিবারের সদস্যরা জানান, হাসপাতালের গেটে গিয়ে তারা অ্যাম্বুলেন্স খুঁজতে থাকেন। সরকারি অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা ময়মনসিংহ যাওয়ার জন্য ৪ হাজার ৫০০ টাকা ভাড়া দাবি করেন।

স্বজনদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত ভাড়া ১ হাজার ৬০০ টাকা উল্লেখ করে তারা প্রথমে ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং পরে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে রাজি হন। কিন্তু চালকরা তাতে রাজি হননি। শুধু তাই নয়, সিন্ডিকেটভুক্ত অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া অন্য কোনো গাড়ি ব্যবহার করতেও বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।

ভাড়া নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে তর্ক-বিতর্ক চলতে থাকে। এই সময়ের মধ্যেই শিশুটির শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে রাত প্রায় ৩টার দিকে নবজাতকটির মৃত্যু হয়।

নিহত শিশুর নানী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “অনেক অনুরোধ করেছি, কিন্তু তারা আমার নাতিকে নিতে রাজি হয়নি। এই সিন্ডিকেটের কারণেই আমার নাতির মৃত্যু হয়েছে।” শিশুটির দাদা জুয়েল মিয়াও একই অভিযোগ করে বলেন, “ভাড়া নিয়ে কথা বলতে বলতেই আমার নাতি মারা যায়, কেউ তাকে নিতে এগিয়ে আসেনি।”

শিশুটির বাবা মো. রোহান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “হাসপাতালের এত কাছেই যদি এমন পরিস্থিতি হয়, তাহলে দূরের রোগীদের কী অবস্থা হয়! আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।”

স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল কেন্দ্রিক একটি অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যারা বাইরের অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশে বাধা দেয় এবং রোগীদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন গাড়িতে তুলতে বাধ্য করে। এতে করে নির্ধারিত ভাড়ার তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযুক্ত অ্যাম্বুলেন্স চালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম জানান, বিষয়টি আগে তার জানা ছিল না। অভিযোগ পেলে আগেই ব্যবস্থা নেওয়া যেত। এখন বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

এদিকে কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. অভিজিত শর্মা বলেন, অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঘটনাটি নিয়ে স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা দ্রুত তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং হাসপাতাল এলাকায় সক্রিয় অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।