ঢাকা | ফেব্রুয়ারী ২৬, ২০২৬ - ৩:২৩ অপরাহ্ন

বিদেশের মোহে কেন হারাবো দেশের ডলার

  • আপডেট: Thursday, February 26, 2026 - 1:08 pm

মো. মামুন হাসান।। প্রকৃতির এক অনন্য ক্যানভাস আমাদের এই বাংলাদেশ। আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও বৈচিত্র্যের বিচারে এই দেশ বিশ্বের অন্যতম সম্পদশালী ভূখণ্ড। পাহাড়ের মিতালি, সমুদ্রের গর্জন, নদীর কলতান, হাওরের নীল জলরাশি, চা বাগানের সবুজ গালিচা আর ম্যানগ্রোভ অরণ্যের রহস্যময়তা সবই যেন বিধাতা এক নিপুণ হাতে একই মানচিত্রে সাজিয়ে দিয়েছেন। পৃথিবীর খুব কম দেশেই এত ঘন এবং স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের সহাবস্থান দেখা যায়। এই অনন্য ভূপ্রকৃতি বাংলাদেশের পর্যটনকে কেবল সম্ভাবনাময় নয়, বরং একটি বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করার সমস্ত উপাদান ধারণ করে। আমরা যখন এশিয়ার পর্যটন মানচিত্র দেখি, তখন থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ বা নেপালের নাম অবধারিতভাবে চলে আসে। কিন্তু বৈচিত্র্যের তুলাদণ্ডে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে তাদের চেয়েও এগিয়ে থাকার দাবি রাখে।

থাইল্যান্ডের অর্থনীতির প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে এবং প্রতিবছর প্রায় ৩ কোটি আন্তর্জাতিক পর্যটক সেখানে ভ্রমণ করে। কিন্তু থাইল্যান্ডের পর্যটনের মূল শক্তি প্রধানত সমুদ্র সৈকত ও বিনোদননির্ভর অবকাঠামো। অন্যদিকে বাংলাদেশের রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ কিলোমিটার। এটি কৃত্রিমভাবে নির্মিত নয়, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক। শুধু সৈকত নয়, একই সফরে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, সিলেটের চা বাগান এবং দক্ষিণের ম্যানগ্রোভ অরণ্য দেখা সম্ভব। এ বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা থাইল্যান্ডের এককেন্দ্রিক পর্যটনের তুলনায় অধিক বৈচিত্র্যময়।

 

মালদ্বীপ বিশ্বব্যাপী বিলাসবহুল দ্বীপ পর্যটনের জন্য পরিচিত। তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ সরাসরি পর্যটন খাতনির্ভর। কিন্তু মালদ্বীপের পর্যটন প্রায় সম্পূর্ণভাবে সমুদ্র ও রিসোর্টনির্ভর। বিপরীতে বাংলাদেশে সমুদ্রের পাশাপাশি রয়েছে পাহাড়ি ঝরনা, মেঘের রাজ্য সাজেক ভ্যালি, দেশের একমাত্র স্বাদু পানির জলাবন রাতারগুল এবং বিস্তীর্ণ জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর। অর্থাৎ বাংলাদেশ একযোগে পাহাড়, বন, সমুদ্র ও নদীমাতৃক সংস্কৃতির সমন্বিত অভিজ্ঞতা দেয়, যা মালদ্বীপের একমাত্রিক প্রকৃতি থেকে অধিক বিস্তৃত।

 

নেপাল প্রধানত হিমালয়কেন্দ্রিক পর্বত পর্যটনের জন্য বিখ্যাত। তাদের পর্যটন আয়ের সিংহভাগ আসে পর্বতারোহী ও ট্রেকিংপ্রেমীদের কাছ থেকে। কিন্তু নেপালে সমুদ্র নেই, বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ নেই, বৃহৎ বদ্বীপ নেই। বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ অঞ্চল হিসেবে একই সাথে পাহাড় ও সমুদ্রের অভিজ্ঞতা দেয়। এই ভূপ্রাকৃতিক সমন্বয় বাংলাদেশের পর্যটনকে তুলনামূলকভাবে অধিক সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক করে তোলে।

 

প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি আমাদের রয়েছে বিশ্বস্বীকৃত অনন্য সব ঐতিহাসিক নিদর্শন যা আমাদের সাংস্কৃতিক গভীরতার পরিচয় দেয়। ইউনেস্কো স্বীকৃত সুন্দরবন কেবল একটি বন নয়, এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ এবং জীববৈচিত্র্যের আধার। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের এই বিচরণভূমি পর্যটকদের জন্য এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে যা দক্ষিণ আমেরিকার আমাজনের চেয়েও কোনো অংশে কম নয়। প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যেও বাংলাদেশ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন নগর সভ্যতার সাক্ষী মহাস্থানগড়, দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম বৌদ্ধ বিহার পাহাড়পুর এবং মধ্যযুগীয় ইসলামী স্থাপত্যের বিস্ময় ষাট গম্বুজ মসজিদ প্রমাণ করে যে এই মাটি হাজার বছরের জ্ঞান ও ঐতিহ্যে লালিত। এই ঐতিহাসিক সম্পদগুলো যদি আধুনিক উপায়ে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা যায়, তবে বাংলাদেশ কেবল প্রকৃতিপ্রেমী নয়, বরং ইতিহাসপিপাসু পর্যটকদের জন্য তীর্থস্থানে পরিণত হবে।

 

অর্থনৈতিক সমীকরণে দেখা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে পর্যটন খাতের অবদান তুলনামূলক কম হলেও এর সম্ভাবনা অসীম। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি বছর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক চিকিৎসা, কেনাকাটা কিংবা স্রেফ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমান। এর ফলে প্রতি বছর প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ বিদেশের মাটিতে চলে যাচ্ছে। এই বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা যদি দেশের অভ্যন্তরে ব্যয় হতো, তবে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ অনেকটাই প্রশমিত হতো। অর্থনীতিবিদদের মতে, পর্যটন খাতে ব্যয়িত প্রতি ১ ডলার স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রায় ৩ থেকে ৪ ডলারের সমপরিমাণ পরোক্ষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করে। সেই হিসেবে যদি এই ৫ বিলিয়ন ডলার দেশের ভেতরে আবর্তিত হতো, তবে এর সামগ্রিক প্রভাব দাঁড়াত প্রায় ১৫ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের সমান। এই বিশাল অর্থ গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করত, প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করত এবং পরিবহন থেকে শুরু করে হস্তশিল্প পর্যন্ত সকল খাতে লক্ষ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করত।

বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা জয়ের পর সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমির যে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে, তা পর্যটন খাতের জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ। গভীর সমুদ্রে ক্রুজ শিপ বা বিলাসবহুল জাহাজ পর্যটন চালু করা গেলে তা আন্তর্জাতিক মানের আকর্ষণ তৈরি করবে। পাশাপাশি বর্তমানে বিশ্বে ‘হালাল পর্যটন’ বা পরিবারবান্ধব পর্যটন বাজারের যে দ্রুত বিস্তার ঘটছে, মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সেখানে অত্যন্ত নিরাপদ ও সংস্কৃতিসম্মত গন্তব্য হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তবে এই অবারিত সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদের কেবল প্রকৃতির ওপর ভরসা করলেই চলবে না। পর্যটন কেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়ন, নিরবচ্ছিন্ন ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকদের জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা অপরিহার্য। পাশাপাশি ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ স্লোগানকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আরও শক্তিশালীভাবে ব্র্যান্ডিং করা প্রয়োজন যাতে বিশ্ববাসী আমাদের এই গোপন রত্নভাণ্ডারের খবর জানতে পারে।

পরিশেষে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, বিদেশের কৃত্রিম ও যান্ত্রিক জৌলুসের মোহে পড়ে নিজেদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করার আগে আমাদের ভাবা উচিত আমাদের নিজের দেশ কতটা অমূল্য সম্পদে পূর্ণ। অভ্যন্তরীণ পর্যটন কেবল বিনোদন বা সময় কাটানো নয়, এটি একটি দেশপ্রেমের পরিচায়ক এবং জাতীয় অর্থনৈতিক মুক্তির কৌশল। আপনি যখন দেশের কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভ্রমণ করেন, তখন আপনার ব্যয় করা সামান্য অর্থ কোনো একজন দরিদ্র মাঝির মুখে হাসি ফোটায়, কোনো রিকশাচালকের অন্ন সংস্থান করে কিংবা কোনো স্থানীয় হস্তশিল্পীর জীবন বদলে দেয়। বিদেশের মাটিতে ডলার বিলিয়ে দেওয়ার চেয়ে নিজ দেশের সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অংশীদার হওয়া অনেক বেশি সার্থক। অতএব, বিদেশের মোহে বৈদেশিক মুদ্রা অপচয় না করে নিজের দেশের মাটি, মানুষ এবং ঐতিহ্যকে জানাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। সঠিক রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা এবং প্রতিটি নাগরিকের সচেতন অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিন বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হবেই।

 

লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান,ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।