ঢাকা | মার্চ ১, ২০২৬ - ১২:৪৭ অপরাহ্ন

শিরোনাম

বারুদের বাসর ও বিশ্বব্যবস্থার প্রসববেদনা

  • আপডেট: Sunday, March 1, 2026 - 11:14 am

মো. মামুন হাসান।। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আজ আর প্রশান্ত নীলের অভয়ারণ্য নয়, বরং তা এখন সাম্রাজ্যবাদী দম্ভ আর প্রতিরোধের বারুদে ঠাসা এক ধূসর অগ্নিগর্ভ, যেখানে প্রতিটি স্ফুলিঙ্গ জানান দিচ্ছে এক পুরাতন বিশ্বব্যবস্থার মৃত্যু আর এক অনিশ্চিত আগামীর প্রসববেদনা।

আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান অপারেশন এপিক ফিউরি শুরুর পর গত চব্বিশ ঘণ্টায় ইরান ও তার মিত্রদের পাল্টা আঘাতে পাল্টে গেছে পৃথিবীর ভূরাজনৈতিক মানচিত্র। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিবিদ ও সমরকৌশলীদের মতে এই যুদ্ধ কেবল একটি দেশ দখলের লড়াই নয় বরং এটি বিশ্বশক্তির ভারসাম্য বা ব্যালেন্স অফ পাওয়ার পুনর্নির্ধারণের এক চূড়ান্ত মহড়া।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে পৃথিবী এখন এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে যেখানে ইউনিপোলার বা একমেরু কেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়া হচ্ছে।

ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায় ১৯১৪ সালের সারায়েভো হত্যাকাণ্ড যেভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দাবানল জ্বালিয়েছিল আজকের এই অভিযান ঠিক তেমনি একটি ক্যাটালিস্ট বা অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। এই যুদ্ধের লেলিহান শিখা কেবল ইরানের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং এটি প্রক্সি ওয়ার বা ছায়া যুদ্ধের খোলস ছেড়ে একটি সর্বাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। লেবানন ভিত্তিক হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা এই সংঘাতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ে প্রমাণ করেছে যে রেজিস্ট্যান্স অ্যাক্সিস বা প্রতিরোধের বলয় কতটা সুসংগঠিত। হিজবুল্লাহ তাদের হাজার হাজার প্রিসিশন গাইডেড মিসাইল দিয়ে উত্তর ইসরায়েলকে কার্যত অচল করে দিয়েছে যেখানে তাদের মূল স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোমকে স্যাচুরেশন পয়েন্টে নিয়ে গিয়ে সেটিকে অকেজো করে দেওয়া। এটি মূলত নাৎসি জার্মানির ব্লিৎসক্রিগ কৌশলের একটি আধুনিক ও বিকেন্দ্রীকৃত সংস্করণ যেখানে শত্রু কোনো নির্দিষ্ট ফ্রন্টে নেই বরং সে সর্বত্র বিদ্যমান।

 

সমর বিশারদদের মতে এই যুদ্ধটি ইতিহাসের অন্য সব সংঘাত থেকে আলাদা কারণ এখানে হাইব্রিড ওয়ারফেয়ারের এক চূড়ান্ত রূপ দেখা যাচ্ছে। ১৯টি দেশের জোট বা ন্যাটোর গতানুগতিক যুদ্ধের বিপরীতে ইরান গত তিন দশক ধরে সরাসরি মুখোমুখি যুদ্ধের চেয়ে অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার বা অসম যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে। ইরান তার ভূগর্ভস্থ মিসাইল সিটি এবং কামিকাজে ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন এক প্রতিরক্ষা দেয়াল তৈরি করেছে যা ভেদ করা আমেরিকা ও ইসরায়েলের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। সমরবিদরা আশঙ্কা করছেন যে এই যুদ্ধ কেবল ইরান ইসরায়েল সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং এটি একটি রিজিওনাল কনফ্ল্যাগ্রেশন বা আঞ্চলিক দাবানলে রূপ নিতে পারে।

বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো এক কঠিন ভূরাজনৈতিক উভয় সংকটে পড়েছে। যদিও এই দেশগুলোর সাথে ইরানের দীর্ঘদিনের বৈরিতা রয়েছে তবুও তারা সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে দ্বিধাগ্রস্ত কারণ রিঅ্যালিস্টিক পলিটিক্স বা বাস্তববাদী রাজনীতির সমীকরণ বলছে যে ইরানের ড্রোন ও মিসাইল তাদের তেল শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করলে তাদের অর্থনীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।

১৯৭৩ সালের আরব ইসরায়েল যুদ্ধের পর তেল অবরোধ যেভাবে পশ্চিমা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের দাম ১৮০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া মানে হলো ডলারের আধিপত্য বা পেট্রোদলার ব্যবস্থার চিরস্থায়ী সমাধি। তবে সমর বিশারদদের একটি অংশ মনে করেন যে যদি ইরান হরমোজ প্রণালী যা একটি অন্যতম ভূরাজনৈতিক চোক পয়েন্ট সেটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় তবে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের আকাশসীমা ইসরায়েলি বা মার্কিন বাহিনীকে ব্যবহারের অনুমতি দিতে বাধ্য হতে পারে যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে।

আমেরিকা ও ইসরায়েলের লাভ ক্ষতির অংকটি এখানে অত্যন্ত জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। ওয়াশিংটন ও তেল আবিব এই অভিযানে যে ট্যাকটিক্যাল সুপিরিওরিটি বা কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বের আশা করেছিল বাস্তব চিত্র তার চেয়ে অনেক বেশি ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো বা নিউক্লিয়ার আর্সেনাল মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া যাতে তারা এই অঞ্চলে চিরস্থায়ী সিকিউরিটি গ্যারান্টি পায়। যদিও তারা আকাশপথে শক্তিশালী হামলা চালিয়েছে কিন্তু ইরানের ভূগর্ভস্থ ফর্দো বা নাতাঞ্জ কেন্দ্রের মতো সুরক্ষিত স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব কারণ সেগুলো কয়েকশ ফুট পাথরের নিচে অবস্থিত।

১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল যে ঝটিকা বিজয় অর্জন করেছিল ইরান সংকটে সেই একই প্রি এম্পটিভ স্ট্রাইক বা আগাম হামলা নীতি কাজ করছে না কারণ ইরান এখন ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো একটি এন্ডলেস কোয়্যাগমায়ার বা অন্তহীন জলাভূমিতে পরিণত হয়েছে। আমেরিকার জন্য এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল রেজিম চেঞ্জ বা শাসন পরিবর্তনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের হারানো আধিপত্য পুনরুদ্ধার করা কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমেরিকানরা নিজেদের এক স্ট্র্যাটেজিক ট্র্যাপ বা কৌশলগত ফাঁদে আবিষ্কার করেছে।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে ইরান যদি তার প্রক্সি নেটওয়ার্ককে পূর্ণ শক্তি দিয়ে লেলিয়ে দেয় তবে ইরাক ও সিরিয়ায় থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো মৃত্যুপুরীতে পরিণত হবে। ইরান কতক্ষণ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে সেই প্রশ্নের উত্তরে সমরবিদরা বলছেন যে ইরান একটি সেলফ সাফিশিয়েন্ট বা স্বয়ংসম্পূর্ণ সামরিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে। তাদের হাতে থাকা হাজার হাজার ব্যালিস্টিক মিসাইল দিয়ে তারা মাসের পর মাস ইসরায়েল ও তার মিত্রদের তটস্থ রাখতে সক্ষম কারণ তাদের রয়েছে কৌশলগত গভীরতা বা স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই যুদ্ধ এক অগ্নিকুণ্ড তৈরি করেছে। ডেমোক্র্যাট বা ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিরোধীরা এই অভিযানকে একটি ডিক্টেটরিয়াল এ্যাডভেঞ্চারিজম হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। বিরোধী শিবিরের মতে ট্রাম্প প্রশাসন কোনো স্পষ্ট এক্সিট স্ট্র্যাটেজি বা যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রকে আরও একটি ফরেভার ওয়ারের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

আমেরিকার প্রধান শহরগুলোতে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে কারণ সাধারণ মানুষ দেখছে যে এই যুদ্ধের ফলে মুদ্রাস্ফীতি এবং তেলের দাম তাদের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ট্রাম্প যদি দ্রুত কোনো সামরিক সাফল্য দেখাতে না পারেন তবে তিনি দেশের ভেতরেই এক বিশাল রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের মুখে পড়তে পারেন। জনগণের বড় একটি অংশ মনে করে যে ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে আমেরিকান তরুণদের জীবন উৎসর্গ করার কোনো নৈতিক যুক্তি নেই। ট্রাম্প বিরোধীরা এই সুযোগে হোয়াইট হাউসকে বেকায়দায় ফেলার জন্য জনমতকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে সংগঠিত করছে যা দেশটির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এই পরিস্থিতিতে সামাজিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক ধস ট্রাম্পের মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন স্লোগানকে এক বিদ্রূপাত্মক পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

এই সংকটে রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা এখন একটি শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক ব্লকের আকার নিয়েছে। মস্কো এই হামলাকে সরাসরি আগ্রাসন হিসেবে অভিহিত করে ইরানকে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও রিয়েল টাইম স্যাটেলাইট গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে। ইউক্রেন যুদ্ধে কোণঠাসা রাশিয়া এখন মধ্যপ্রাচ্যকে ব্যবহার করে আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক ওভারস্ট্রেচ বা কৌশলগত অতিবিস্তারের সুযোগ নিচ্ছে। মস্কোর সরবরাহ করা এস ৪০০ বা এস ৫০০ সিস্টেম ইসরায়েলি এফ ৩৫ এর শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

অন্যদিকে বেইজিং আমেরিকার বিকল্প শান্তি দূত হিসেবে আবির্ভূত হতে চাইছে যাতে গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভের অধীনে ওয়াশিংটনের প্রভাব স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা যায়। চীন এখানে সান জু এর আদর্শে বিশ্বাসী যেখানে যুদ্ধ না করেই শত্রুকে পরাস্ত করার কৌশল নেওয়া হয়। আমেরিকা যখন বারুদ খরচ করছে চীন তখন মধ্যপ্রাচ্যের পুনর্গঠন ও জ্বালানি নিরাপত্তার ব্লু প্রিন্ট পকেটে নিয়ে বসে আছে। এই মহাপ্রলয়ে বিশ্ব গণমাধ্যমও এখন ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার বা তথ্যযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে যেখানে সিএনএন ও বিবিসি একপক্ষীয় প্রচারণা চালাচ্ছে অন্যদিকে আল জাজিরা ও আরটি পশ্চিমা হেজিমনি বা আধিপত্যবাদের স্বরূপ উন্মোচন করছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এই যুদ্ধ এক অস্তিত্ব সংকট তৈরি করেছে কারণ তেলের দাম ব্যারেলে ১৮০ ডলার স্পর্শ করা মানেই হলো বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির ওপর মুদ্রাস্ফীতির এক ভয়াবহ সুনামি।

পরিশেষে বলা যায় যে আমেরিকা ও ইসরায়েল হয়তো প্রযুক্তির জোরে যুদ্ধে সাময়িক এগিয়ে থাকবে কিন্তু রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে তারা একটি অন্তহীন চোরাবালিতে পা দিয়েছে। যদি এখনই ডিপ্লোম্যাটিক ডিএসক্যালেশন বা কূটনৈতিক উপায়ে উত্তেজনা প্রশমন করা না যায় তবে পৃথিবী ১৯৩০ এর দশকের গ্রেট ডিপ্রেশনের চেয়েও বড় অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন হবে। সমর বিশারদদের মতে এই সংঘাতের মাধ্যমে বিশ্ব এক নতুন মাল্টিপোলার ওয়ার্ল্ডে প্রবেশ করছে যেখানে পশ্চিমা আধিপত্যের পতন অবধারিত।

২০২৬ সালের এই বসন্ত আসলে কোনো সাধারণ ঋতু পরিবর্তন নয় বরং এটি একটি পলি ক্রাইসিস যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ড্রোন যুদ্ধ এবং পারমাণবিক হুমকি একসাথে মিলেমিশে একাকার। যুদ্ধের ময়দানে হয়তো উন্নত ড্রোন আর মিসাইল জয়ী হবে কিন্তু সভ্যতার ইতিহাসে জয়ী হবে কেবল ধ্বংস আর হাহাকার। বিশ্ববাসী এখন শঙ্কিত চিত্তে প্রার্থনা করছে যে এই সংঘাত যেন মানবসভ্যতার শেষ বসন্ত না হয়। সভ্যতার বিবর্তনে আমরা কি তবে আবার সেই মধ্যযুগীয় বর্বরতার দিকে ফিরে যাচ্ছি যেখানে গায়ের জোরই ছিল একমাত্র আইন। উত্তরটি হয়তো ভবিষ্যতের রণক্ষেত্রের ধোঁয়ায় ঢাকা পড়ে আছে কিন্তু রক্তপাত যে কারো জন্যই কল্যাণ বয়ে আনবে না তা নিশ্চিত।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট