পাহাড়ে কি ন্যায়বিচারেরও দুই রং? এক বাকপ্রতিবন্ধী তরুণীর আর্তনাদে জেগে উঠছে কঠিন প্রশ্ন
আক্তার হোসেন।।
পার্বত্য চট্টগ্রাম—শান্তি, সহাবস্থান আর সম্প্রীতির কথা আমরা প্রায়ই শুনি। বলা হয়, এই পাহাড় বহু জাতিগোষ্ঠীর মিলনের প্রতীক। কিন্তু কখনো কখনো এমন কিছু ঘটনা সামনে আসে, যা সেই সুন্দর কথাগুলোর ভেতরের অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে নগ্ন করে দেয়।
একজন বাকপ্রতিবন্ধী তরুণী।
নিজের কণ্ঠে প্রতিবাদ করার ক্ষমতাও যার নেই।
সেই তরুণী উনিংকার মারমা (২১)—খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা উপজেলার হাতছড়ি ইউনিয়নের হাফছড়ি পাড়ার বাসিন্দা। গত ৩ মার্চ ২০২৬, সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে তিনি নিজের এলাকা থেকে জালিয়াপাড়ার উদ্দেশ্যে বের হন। কিন্তু তারপর আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
একটি পরিবার তখন পাগলের মতো খুঁজে বেড়িয়েছে তাদের মেয়েকে।
শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তারা গুইমারা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করে।
প্রথম থেকেই আশঙ্কা ছিল ভয়ংকর কিছু ঘটেছে।
পুলিশ ও সেনাবাহিনী বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধান চালালেও দিনের পর দিন মেয়েটির কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পাহাড়ের নীরবতা যেন গিলে ফেলেছিল একজন অসহায় তরুণীর আর্তনাদ।
অবশেষে ৯ মার্চ সকালে খবর আসে—দুর্বৃত্তরা তাকে জালিয়াপাড়া এলাকায় ফেলে রেখে গেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—
এই কয়েকটি দিন তার সাথে কী ঘটেছিল?
উদ্ধারের পর তাকে দ্রুত মানিকছড়ি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকরা আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তাকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে পাঠান, ডিএনএ পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য।
এদিকে একই দিন বিকেলে স্থানীয় জনগণ সিন্দুকছড়ি ইউনিয়নের গড়াইছড়ি এলাকা থেকে এক যুবককে আটক করে। অভিযোগ উঠেছে—এই যুবক অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনার সাথে জড়িত।
আটক ব্যক্তির নাম অংক্যজায় মারমা (৩৭)। স্থানীয়দের দাবি, তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ক্যজ মারমা (৫০) ইতোমধ্যে ভারতে পালিয়ে গেছে।
আরও বিস্ময়কর বিষয়—স্থানীয় সূত্র বলছে, আটককৃত ব্যক্তি বর্তমানে সিন্দুকছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের হেফাজতে রয়েছে।
এখানেই শুরু হয় সবচেয়ে তীব্র প্রশ্নগুলো।
অভিযোগ উঠেছে, কিছু আঞ্চলিক সংগঠন বিষয়টি রাষ্ট্রীয় আইনের আওতায় না এনে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করছে। এমনকি ভুক্তভোগী পরিবারের ওপরও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—
একজন বাকপ্রতিবন্ধী তরুণীর সম্ভাব্য অপহরণ ও নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগ কি কোনোভাবেই স্থানীয় দরকষাকষি বা সামাজিক চাপে মীমাংসা হতে পারে?
আরও বড় প্রশ্ন উঠছে পাহাড়ের মানুষের মনে।
অতীতে বহুবার দেখা গেছে—যদি কোনো বাঙালি যুবকের বিরুদ্ধে পাহাড়ি নারীর সাথে এমন অভিযোগ ওঠে, তখন পুরো পাহাড় উত্তাল হয়ে ওঠে। মিছিল হয়, প্রতিবাদ হয়, কঠোর বিচারের দাবি ওঠে।
কিন্তু যখন একই ধরনের অভিযোগ নিজেদের সম্প্রদায়ের ভেতরে ঘটে, তখন কেন অনেক সময় সেটি নীরবে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়?
কেন তখন আইনের বদলে স্থানীয় মীমাংসার কথা সামনে আসে?
একজন নির্যাতিত নারীর আর্তনাদ কি তার অপরাধীর পরিচয় দেখে বিচার পাবে?
ন্যায়বিচার কি জাতি দেখে?
মানবাধিকার কি সম্প্রদায় দেখে?
আইনের শাসনের মূল কথা খুবই স্পষ্ট—
অপরাধী যে-ই হোক, তার বিচার হবে আইনের মাধ্যমে।
কিন্তু যদি কোনো অপরাধের বিচার নির্ধারিত হয় ক্ষমতা, প্রভাব বা সামাজিক চাপের মাধ্যমে—তাহলে সেই সমাজে ন্যায়বিচারের জায়গা কোথায়?
আজ প্রশ্নটা শুধু উনিংকার মারমার নয়।
প্রশ্নটা পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
একই পাহাড়ে বসবাস করেও কেন ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে দেখা যাবে দুই ধরনের আচরণ?
একজন বাকপ্রতিবন্ধী তরুণীর নীরব কান্না কি পাহাড়ের নীরবতায় চাপা পড়ে যাবে—
নাকি এই ঘটনার মধ্য দিয়েই উঠে আসবে একটাই দাবি—
অপরাধী যে-ই হোক, বিচার হতে হবে আইনের সামনে।
কারণ বিচার যদি সমান না হয়,
তাহলে শান্তির কথাও একদিন ফাঁকা শব্দে পরিণত হবে।











