জলবায়ু পরিবর্তনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হুমকির মুখে শিশুরা
জয়নাল আবেদীন।। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের শিশুরা। অথচ এই বিষয়টাকে আমরা খেয়ালই করি না। ফলে ৮৫ শতাংশ শিশু বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া জলবায়ুর প্রভাবে যেসব দেশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এরমধ্যে বাংলাদেশ অত্যন্ত সঙ্কটাপন্ন।
ইউনিসেফ বাংলাদেশের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত অবক্ষয় শিশুদের অধিকার খর্ব করে; বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের। দুর্যোগ মৌসুমে উপকূলবাসী নানান ঝুঁকি নিয়ে তটস্থ থাকলেও তাদের সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা পরিবারের শিশুদের নিয়ে।
জাতিসংঘ শিশু তহবিল, ইউনিসেফ’র নির্বাহী পরিচালক অ্যান্থনি লেক বলেছেন, বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন কারণে যেসব মৃত্যু ঘটছে তার ৯০ শতাংশই ঘটছে উন্নয়নশীল দেশে এবং এসব মৃত্যুর আশি শতাংশই শিশু। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যতই চরম রূপ লাভ করছে এবং দৃশ্যমান হচ্ছে ততোই তার বিরূপ প্রভাবে বিশ্বের শিশু এবং কিশোরদের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
ইউনিসেফের প্রতিবেদনে জ্ঞানের বিস্তার ও ব্যবহার জোরদার করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের জন্য আরও উন্নত প্রকল্প তৈরি ও পলিসি এ্যাডভোকেসিতে সহায়তা করার সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদী ভাঙনের কারণে বাংলাদেশ কতটা অরক্ষিত এবং জলবায়ু পরিবর্তন কতোটা দ্রুত এই পরিস্থিতির অবনতি ঘটনাচ্ছে সে বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ গৃহহারা হয়েছে। যেখানে ঢাকার ৭০ শতাংশ বস্তিবাসী পরিবেশগত অভিবাসী। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সার্বজনীন সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি, শিশু বিবাহ ও শিশুশ্রম বন্ধ এবং ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূরীকরণের মতো বাংলাদেশের উন্নয়নমূলক অর্জনগুলোকে হুমকির মুখে ফেলেছে জলবায়ু পরিবর্তন।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বয়স্কদের তুলনায় শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে আছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে যেসব রোগব্যাধি দেখা দিচ্ছে তার প্রায় ৮৫ শতাংশেই আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শিশুদের মধ্যে পানি ও বাতাস বাহিত রোগব্যাধি, অপুষ্টি, দুর্যোগকালীন মৃত্যু ও আঘাতের হার বাড়ছে। বন্যার কারণে শিশুদের দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের স্কুল বন্ধ থাকছে।
জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে পরিবারগুলো তাদের জীবিকা হারাচ্ছে এবং মৌলিক সুবিধাহীন শহুরে বস্তিগুলোতে অভিবাসিত হচ্ছে। যেখানে শিশুরা সহিংসতা, শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এই শিশুরা প্রায়ই স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিচ্ছে। পাশাপাশি ছেলে শিশুরা শিশুশ্রম ও মেয়ে শিশুরা শিশুবিবাহের ঝুঁকিতে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈষম্য আরও প্রকট আকার ধারণ করছে এবং সুরাহা না হলে সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকা শিশুরাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করা হয়।
‘জলবায়ু পরিবর্তন ও শিশুদের বিষয়ে নীতি পর্যালোচনা, প্রাতিষ্ঠানিক ম্যাপিং ও কর্মপরিকল্পনা’ শীর্ষক ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের (বিসিএএস) একটি যৌথ প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এই প্রতিবেদনের মূল বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হয়।
ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি এডুওয়ার্ড বিগবেডার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসমূহ সুস্পস্ট। যা সামঞ্জস্যহীনভাবে শিশুদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। জীবনের একটি ভালো সূচনা নিশ্চিত করতে এবং প্রত্যেক শিশুকে তাদের সম্পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী গড়ে তুলতে ইউনিসেফ আরও অবদান রাখতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। একই সঙ্গে শিশুদের জন্য সুন্দর জীবন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০২০ সালের মধ্যে সামাজিক খাতের বাজেটের ২০ শতাংশ শিশুদের পেছনে বিনিয়োগ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে ইউনিসেফ।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে আমাদের মিলিত কার্যক্রম দুর্যোগের দয়ার ওপর বেঁচে থাকা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিকাশে দুর্দশার অবসান ঘটাবে; যা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বৈষম্য প্রতিহত করতে সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকা কিশোর-কিশোরীদের লক্ষ্য করে অগ্রাধিকারমূলক কর্মপন্থা প্রণয়নে ইউনিসেফের প্রতি সুপারিশ করা হয়।











