ঢাকা | নভেম্বর ২৯, ২০২৫ - ৩:৫৫ অপরাহ্ন

শিরোনাম

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক: ১০ হাজার কোটি টাকার কাজ ঠেকেছে ২৮ হাজার কোটিতে

  • আপডেট: Saturday, November 29, 2025 - 12:18 pm

জাগো জনতা অনলাইন।। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করতে ২০১৩-১৫ সালে সমীক্ষা চালায় সুইডিশ কনসালট্যান্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের সমীক্ষা প্রতিবেদনে এ কাজের জন্য প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে জাপানের কোম্পানি মারুবেনিকে দিয়ে চালানো হয় আরেক দফা সমীক্ষা। ২০১৯ সালে প্রতষ্ঠানটি সমীক্ষা প্রতিবেদন জমা দিলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

এরপর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগ আরেকটি সমীক্ষা চালিয়ে ২০২১ সালে প্রতিবেদন জমা দেয়। সেটিও যেন লাল ফিতায় বন্দি। বর্তমানে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে আরেকটি সমীক্ষা চালানো হচ্ছে। যদিও একটি প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন প্যাকেজে ইতোমধ্যে ৪৭ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। এতে ব্যয় হচ্ছে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

চার লেন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত সড়ক ও জনপথের (সওজ) প্রকৌশলীরা বলছেন, ১৫৯ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কটির অবশিষ্ট ১১২ কিলোমিটার দ্রুত সময়ের মধ্যে কেবল চার লেনে উন্নীত করা হলে ব্যয় হতে পারে ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রকল্পের কাজ যত বিলম্বিত হবে, ব্যয়ের পরিমাণও বাড়বে। আর বাস্তবায়নাধীন সড়ক সম্প্রসারণ ব্যয় হিসেবে ধরা হলে মহাসড়ককে দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত করতে ব্যয় গিয়ে দাঁড়াবে ২৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়।

সওজ সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের মধ্যে নগরীর বহদ্দারহাট মোড় থেকে শিকলবাহা ‘ওয়াই জংশন’ পর্যন্ত আট কিলোমিটার এবং কক্সবাজার শহর থেকে লিংক রোডের বাঁকখালী নদী পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার সড়ক ইতোমধ্যে চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে। ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন তিন বাইপাস ও এক ওভারপাস নির্মাণে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে ক্রস বর্ডার প্রকল্পের আওতায় চারটি সেতুর সঙ্গে যুক্ত আরও পাঁচ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হবে। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ৪৭ কিলোমিটার সড়ক চার লেন করার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সড়কটি চার লেনে উন্নীত করার আগে ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হাইওয়ে ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট-১’ নামে একটি প্রকল্পের আওতায় এ কাজ করা হচ্ছে।

সর্বশেষ বুয়েট পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. ইশতিয়াক আহমেদের নেতৃত্বে চালানো সমীক্ষা প্রতিবেদনে মহাসড়কটি উন্নয়নে দুটি প্রস্তাবনা দেওয়া হয়। একটি হচ্ছে, বিদ্যমান সড়ক রেখে সার্ভিস রুটসহ ছয় লেনে উন্নীত করা। আরেকটি প্রস্তাবনায় ভায়াডাক্ট সড়ক (ফ্লাইওভার ধরনের সড়ক) নির্মাণ করা। সড়কের দুই পাশে বিপুল সংখ্যক স্থাপনা রয়েছে, যেগুলো ভাঙতে হবে। কিন্তু ভায়াডাক্ট সড়ক হলে এগুলো ভাঙতে হবে না। এ ধরনের সড়ক দিয়ে নির্বিঘ্নে ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১১০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালানো যাবে। এতে বর্তমানের চেয়ে অনেক কম সময়ে কক্সবাজারে চলাচল করা যাবে। এ জন্য ভায়াডাক্ট সড়ক করার পক্ষে বেশি জোর দিয়েছিল বুয়েটের সমীক্ষা। সেটিও বাতিল করে নতুন করে সমীক্ষা চালানো হচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সমীক্ষা টিমে কাজ করা সড়ক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ভায়াডাক্ট সড়ক করা হলে কম ভূমি অধিগ্রহণ ও স্থাপনা ভাঙতে হবে। তা ছাড়া মহাসড়কটির দুই পাশে বড় একটি অংশে রয়েছে পাহাড়। বৃষ্টিপাত হলেই সড়কে বালু জমে যায়। আবার যানবাহন চলাচলের কারণে হাতিসহ প্রাণী চলাচল ব্যাহত হয়। ভায়াডাক্ট সড়ক হলে এসব সমস্যায় পড়তে হতো না। বিদ্যমান সড়কটিও কাজে ব্যবহার করা যেত।

দেশের সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকত রয়েছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে। টেকনাফে রয়েছে মিয়ানমারের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানির একমাত্র স্থলবন্দর। ফলে দেশের পূর্বমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুই লেনের সড়কটি এতটাই দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে পড়েছে, এটি এখন ‘মরণফাঁদ’। সড়কটি এমনিতেই সরু; কিছুদূর পরপর রয়েছে বিপজ্জনক বাঁক। দেশের প্রধান লবণ উৎপাদন এলাকা কক্সবাজার। সেখান থেকে আসা লবণবোঝাই ট্রাকের লবণ পানিতে পিচ্ছিল হয়ে ওঠে সড়ক। তাতে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ গাড়ি চলাচল করে এই সড়কে। এসব কারণে প্রায় সময়ই সড়কটিতে দুর্ঘটনা লেগেই থাকে।

সর্বশেষ গত ৫ নভেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে প্রাইভেটকারের মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের পাঁচজন নিহত হন। সড়ক ও জনপথ বিভাগ গত ১৩ মার্চ একটি জরিপের ফল প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, এই মহাসড়কে দিনে গড়ে ২৬ হাজার ৬৮৪টি যানবাহন চলাচল করে। এর মধ্যে ৪০ শতাংশই তিন চাকার গাড়ি।

সওজের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বাসচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নামেই শুধু মহাসড়ক। বাস্তবে এটি খুবই কম প্রস্থের। ১৫৯ কিলোমিটার দীর্ঘ দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই সড়কটির ৪০ কিলোমিটারের প্রশস্ততা মাত্র ১৮ ফুট। অবশিষ্ট অংশে ৩৪ ফুট প্রস্থ। ফলে বিপরীত দিক থেকে আসা বাসকে সাইড দিতে আরেকটি বাসকে বেগ পেতে হয়। অনেক সময় মূল সড়কের বাইরে চলে যায় বাস।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রকৌশলীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মহাসড়কটির চট্টগ্রাম নগরীর কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতুর দক্ষিণাংশ থেকে চকরিয়ার খুটাখালী পর্যন্ত ১১৫ কিলোমিটার সড়কে ৫০টির বেশি স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে। এ ছাড়া ১৫টির বেশি স্থানে সড়কের ওপর রয়েছে হাটবাজার।

 

সওজের চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল নোমান পারভেজ বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেন করার ক্ষেত্রে কত টাকা ব্যয় হবে, নির্ভর করবে চলমান সমীক্ষার ওপর। ধারণা করা যায়, বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের বাইরে সড়কের অবশিষ্ট অংশ যদি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মতো চার লেন করা হয়, তাহলে কমবেশি ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। এ ছাড়া ইতোমধ্যে যে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, ব্যয়ের সেই অঙ্কটা যোগ করা হলে পুরো সড়কটিকে চার লেন করতে মোট ব্যয় গিয়ে ঠেকবে সাড়ে ২৮ হাজার কোটি টাকায়। আবার যদি সড়কের ওপর থাকা হাটবাজার রক্ষায় আন্ডারপাস করা হয় কিংবা পুরো সড়ককে এক্সপ্রেসওয়ে করা হয়, সে ক্ষেত্রে ব্যয়ের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে।