ঢাকা | মার্চ ৩, ২০২৬ - ৯:৩৭ অপরাহ্ন

শিরোনাম

খাগড়াছড়ি রাঙামাটি বান্দরবান ও কক্সবাজার: চার জনপদে এক পর্যটকের পদচিহ্ন

  • আপডেট: Tuesday, March 3, 2026 - 8:14 pm

সবুজ দাস।। প্রকৃতির অমোঘ টানে মানুষ ঘর ছাড়ে। অজানাকে জানার আর অদেখাকে দেখার এক চিরন্তন তৃষ্ণা তাকে অহরহ তাড়িয়ে বেড়ায়। সেই তৃষ্ণা মেটাতেই সম্প্রতি পা রেখেছিলাম বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চলের চার রূপসী জনপদে। খাগড়াছড়ি রাঙ্গামাটি বান্দরবান ও কক্সবাজারের সেই দীর্ঘ পথপরিক্রমা কেবল এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যান্ত্রিক ভ্রমণ ছিল না বরং তা ছিল অরণ্য পাহাড় আর সাগরের এক অপূর্ব মেলবন্ধনের সাক্ষী হওয়া। নাগরিক জীবনের কোলাহল আর ইট কাঠের যান্ত্রিকতা যখন মানুষের শ্বাসরোধ করে ধরে তখন এই জনপদগুলোই হয়ে ওঠে মুক্তির একেকটি উন্মুক্ত জানালা। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা শীতল বাতাস আর সাগরের নোনা জলের গর্জনে যে জীবনবোধ লুকিয়ে আছে তা কেবল একজন প্রকৃত পর্যটকই অনুধাবন করতে পারেন।

আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল খাগড়াছড়ির বুনো পাহাড়ে। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা রহস্য যেন আলুটিলা রহস্যময় গুহার ভেতরে আরও ঘনীভূত হয়। মশালের আলোয় পিচ্ছিল সেই আদিম সুড়ঙ্গ পথ পাড়ি দেওয়ার রোমাঞ্চ হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। রাইসিং ঝর্ণার ঝিরঝির শব্দ আর তারেংয়ের পাহাড় চূড়া থেকে দেখা দিগন্ত বিস্তৃত মেঘের আনাগোনা এক অতীন্দ্রিয় প্রশান্তি দান করে। খাগড়াছড়ির স্বর্ণ মন্দিরের শান্ত গম্ভীর পরিবেশ আর পাহাড়ের সুগভীর নিস্তব্ধতা মানুষের মনে আধ্যাত্মিক এক ভাবনার জন্ম দেয়। এরপর পাহাড়ি আঁকাবাঁকা সর্পিল পথ পেরিয়ে যখন রাঙ্গামাটিতে পৌঁছালাম তখন চোখের সামনে ধরা দিল নীল জলরাশির কাপ্তাই লেক। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা এই বিশাল লেকটি যেন এক শান্ত নীল আয়না। ইঞ্জিনের নৌকায় চড়ে যখন লেকের বুক চিরে বোট এগিয়ে চলে তখন দুই ধারের ছোট ছোট টিলা আর ঝুলন্ত ব্রিজের শৈল্পিক কারুকাজ মনে এক অন্যরকম মোহ তৈরি করে। পলওয়েল পার্কের আধুনিক সুযোগ সুবিধা আর লেক ভিউর স্নিগ্ধতা যেন পর্যটকের দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি নিমিষেই ধুয়ে মুছে দেয়।

ভ্রমণের পথে বান্দরবান যেন নিজেকে আরও উঁচুতে মেলে ধরেছে। নীলগিরি আর নীলাচলের চূড়ায় দাঁড়ালে মনে হয় আকাশটা বোধহয় হাতের নাগালেই চলে এসেছে। মেঘেরা এখানে পর্যটকের কাঁধে হাত দিয়ে হাঁটে আর কুয়াশার শুভ্র চাদর মুহূর্তেই ঢেকে দেয় চারপাশ। প্রান্তিক লেকের টলটলে শান্ত জল আর মেঘনা পর্যটন কেন্দ্রের আদিম প্রাকৃতিক রূপ যেন এক স্বপ্নিল জগতের হাতছানি দেয়। পাহাড়ের এই গাম্ভীর্যপূর্ণ যাত্রা শেষ করে যখন কক্সবাজারের উপকূলে পৌঁছানো যায় তখন সাগরের বিশালতা এক অন্যরকম আধ্যাত্মিক তৃপ্তি দেয়। কলাতলী সুগন্ধা আর ইনানী বীচের তীরে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব। হিমছড়ির ঝর্ণার শীতল ধারা আর খান বীচে লবণের শুভ্র চাষের দৃশ্য এক ভিন্ন মাত্রার গ্রাম্য বাস্তবতা তুলে ধরে। বিশেষ করে ৬০ মেগাওয়াট বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিশাল ডানাগুলো যখন সমুদ্রের মাতাল হাওয়ায় ঘোরে তখন প্রযুক্তির সাথে প্রকৃতির এক অসাধারণ মিতালি চোখে পড়ে যা দেশের অগ্রগতিরই এক প্রতিচ্ছবি।

তবে পর্যটকদের অভিজ্ঞতাকে আরও চমকপ্রদ এবং স্মরণীয় করতে আমাদের পর্যটন পরিকল্পনাকে আরও আধুনিক ও বৈশ্বিক মানে উন্নীত করা সময়ের দাবি। পাহাড়ের চূড়ায় কেবল সাধারণ পর্যটন কেন্দ্র নয় বরং গ্লাস ফ্লোর স্কাইওয়াক বা কাঁচের তৈরি হাঁটার পথ তৈরি করা যেতে পারে যা পর্যটকদের হাজার ফুট উঁচুতে শূন্যে হাঁটার এক অভাবনীয় শিহরণ দেবে। বিশেষ করে বান্দরবান বা খাগড়াছড়ির সুউচ্চ কোনো পাহাড়ের সংযোগস্থলে আন্তর্জাতিক মানের বাঞ্জি জাম্পিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে যা অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় দেশি বিদেশি পর্যটকদের কাছে আমাদের আকর্ষণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

কাপ্তাই লেককে কেন্দ্র করে আন্ডারওয়াটার রেস্টুরেন্ট এবং বান্দরবানের দুর্গম এলাকায় বাবেল ট্রি হাউস বা আধুনিক বৃক্ষ কুটির নির্মাণের মাধ্যমে অরণ্যের সাথে মানুষের নিবিড় সংযোগ ঘটানো সম্ভব। বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন নির্দিষ্ট একটি বিশাল এলাকা শুধুমাত্র তাদের জন্য সংরক্ষিত জোন হিসেবে ঘোষণা করা যেতে পারে। সেখানে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের রুচি ও চাহিদার কথা মাথায় রেখে বিশেষায়িত সার্ফিং স্কুল বীচ কার্নিভাল এবং প্রাইভেট ক্যাবানা চালু রাখা প্রয়োজন যাতে তারা পরিপূর্ণ নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

বর্তমান বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বিদেশের পর্যটকদের জন্য ডিজিটাল নোম্যাড জোন তৈরি করা এখন অত্যন্ত জরুরি যেখানে পাহাড়ের চূড়ায় বসেই উচ্চগতির ইন্টারনেটে অফিসের কাজ করা যাবে। এর পাশাপাশি অ্যাগ্রো ট্যুরিজম বা কৃষি পর্যটনকে জনপ্রিয় করতে ইনানী বা খান বীচ এলাকায় লবণ চাষ এবং পাহাড়ি জুম চাষে পর্যটকদের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা যেতে পারে। তারা নিজের হাতে লবণ সংগ্রহ করবে বা জুমের ফল তুলে সেই অভিজ্ঞতার একটি সনদ পাবে যা হবে পর্যটকদের কাছে এক অমূল্য স্মারক।

পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পরিবেশ রক্ষায় স্মার্ট প্লাস্টিক ব্যাংক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ট্যুরিস্ট অডিও গাইড অ্যাপ চালু করা প্রয়োজন যা বিভিন্ন ভাষায় পর্যটকদের তথ্য দিয়ে সহায়তা করবে। বিশেষ করে কক্সবাজারে পরিকল্পিত তিনটি প্রধান মেগা প্রকল্প সাবরাং ট্যুরিস্ট পার্ক নাফ ট্যুরিস্ট পার্ক বা জালিয়ার দ্বীপ এবং সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিস্ট পার্ক অতি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এই প্রকল্পগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে আমাদের পর্যটন খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে এবং বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে।

এই অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব ইকো ফ্রেন্ডলি রিসোর্ট নির্মাণে সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। প্লাস্টিক দূষণ রোধে কঠোর আইন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে যাতে পাহাড় ও সাগরের বাস্তুসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় গাইডদের পেশাদার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত। সঠিক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা আর আধুনিক মনস্ক উদ্ভাবনী চিন্তার সমন্বয় ঘটলে এই চার জনপদ কেবল আমাদের গর্বের স্থান নয় বরং বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা গন্তব্য হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

লেখক: জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ ,সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।