কক্সবাজারে পর্যটন শৃঙ্খলা রক্ষায় দিনরাত টুরিস্ট পুলিশের তৎপরতা
নেতৃত্বে অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ
কক্সবাজার প্রতিনিধি।
বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের শহর কক্সবাজারে পর্যটনের মৌসুম মানেই লাখো দর্শনার্থীর ঢল। এছাড়াও সারা বছর এখানে পর্যটকের পদচারণা থাকে চোখে পড়ার মতো। এই বিপুল দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও সেবাদান নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে কক্সবাজার টুরিস্ট পুলিশের চৌকস টিম। সংস্থাটির সামগ্রিক নেতৃত্বে রয়েছেন পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ। যিনি কেবল টুরিস্ট পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে ৯ বছর ধরে কর্মরত।
কক্সবাজার টুরিস্ট পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সৈকতের লাবণী, কলাতলী, সুগন্ধা, হিমছড়ি, ইনানী, পাটুয়ারটেক পয়েন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ স্পটে দিনরাত টহল জোরদার করা হয়েছে। মোটরসাইকেল ও ফুট প্যাট্রোলের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ টিম পর্যটকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
এছাড়াও সন্ধ্যার পর বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়, বিশেষ করে ছুটির দিন ও ভরা মৌসুমে এমন সংখ্যা বেশি থাকে। ইভটিজিং, ছিনতাই, চুরি, বিচ বয়, হিজড়া, দালালচক্র ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের মতো অভিযোগে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে অহরহ। হোটেল বুকিং, যানবাহন ভাড়া বা ট্যুর প্যাকেজ নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ প্রতিরোধে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। অসাধু দালাল ও চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা ও জরিমানার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি সৈকতের বালিয়াড়ি দখলও শক্ত হাতে প্রতিরোধ করা হচ্ছে বলে জানান হাজারও দর্শনার্থীসহ স্থানীয়রা। পাশাপাশি পর্যটকদের সচেতন করতে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ এবং সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইনও চালানো হচ্ছে। এছাড়া, নারী ও বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ নজরদারি টিম গঠন করা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য হটলাইন ও কন্ট্রোল রুম সক্রিয় রাখা হয়েছে। বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে দূতাবাসের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় সহায়তাও প্রদান করছে টুরিস্ট পুলিশ।
স্থানীয়দের মতে, অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মাঠমুখী তদারকি ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অপরাধ অনেক কমে এসেছে। তাঁর নির্দেশনায় টুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা পর্যটন এলাকার নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছেন। পর্যটননির্ভর অর্থনীতির শহর কক্সবাজারে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় থাকলে দেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হবে, এমনটাই মনে করছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদের নেতৃত্বে কক্সবাজার সৈকতে অবৈধভাবে বালিয়াড়ি দখল ও স্থাপনা নির্মাণের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজারে পরিবেশ সুরক্ষা ও পর্যটন এলাকার শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কক্সবাজার টুরিস্ট পুলিশ এই উচ্ছেদ কার্যক্রম চালায়। অভিযানে সৈকতসংলগ্ন বালিয়াড়ি দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকান, কিটকট, অস্থায়ী স্থাপনা ও বাণিজ্যিক কাঠামো অপসারণ করা হয় এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বালিয়াড়ি কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অংশ নয়, এটি সমুদ্র সুরক্ষারও প্রাকৃতিক বাঁধ; ফলে দখলমুক্ত রাখা পর্যটন ও পরিবেশ—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। এই নিয়ে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত থাকবে বলে টুরিস্ট পুলিশ জানিয়েছে।
এর বাইরে অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল প্রতারণা ও দালালচক্র-সংশ্লিষ্ট ঘটনা। হোটেল বুকিং, ট্যুর প্যাকেজ, যানবাহন ভাড়া এবং অবৈধ গাইডিংকে কেন্দ্র করে এসব অভিযোগ উঠে আসে। ছিনতাই ও চুরির ঘটনা ছিল প্রায় ২৪ শতাংশ, নারী হয়রানি বা ইভটিজিং ৯ শতাংশ, মারামারি ও বিশৃঙ্খলা ১১ শতাংশ এবং মাদক ও অন্যান্য অপরাধ মিলিয়ে প্রায় ১৮ শতাংশ। বিশ্লেষণে দেখা যায়, অপরাধের একটি বড় অংশ মৌসুমি, বিশেষ করে ঈদ, পূজা ও শীতকালীন ছুটির সময় অভিযোগের হার বেড়ে যায়।
সময়ভিত্তিক পর্যালোচনায় মার্চ-এপ্রিল (রমজান-ঈদ মৌসুম) এবং অক্টোবর-ডিসেম্বর (দুর্গাপূজা ও শীতকাল) সময়ে অভিযোগের চাপ বেশি ছিল। এসব সময়ে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ১২০ হাজার পর্যটকের উপস্থিতি থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সৈকতের লাবণী, কলাতলী ও সুগন্ধা পয়েন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ২৪ ঘণ্টা মোটরসাইকেল প্যাট্রোল, ফুট টহল ও ভ্রাম্যমাণ টিম মোতায়েন রাখা হয়। সিসিটিভি মনিটরিং ও কন্ট্রোল রুমও সক্রিয় রাখা হয়েছে, যদিও নির্জন ও তুলনামূলক অন্ধকার অংশে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও ক্যামেরা কাভারেজ নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।
পর্যটকদের অভিজ্ঞতায় মিলেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কয়েকজন পর্যটক জানিয়েছেন, সন্ধ্যার পরও সৈকতে পুলিশ টহল চোখে পড়েছে এবং পরিবার নিয়ে নিরাপদ অনুভব করেছেন। হারানো মালামাল উদ্ধারে দ্রুত সহায়তার ঘটনাও আছে। তবে অন্যদিকে অতিরিক্ত কক্ষভাড়া দাবি, মৌসুমে যানবাহনের ভাড়া বৃদ্ধি, অস্বাস্থ্যকর খাবার ও সৈকতের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। একাধিক ক্ষেত্রে অনলাইনে নির্ধারিত রুম ভাড়ার চেয়ে বেশি অর্থ দাবি করার অভিযোগ ওঠে, যা টুরিস্ট পুলিশের হস্তক্ষেপে সমাধান হয়েছে বলে জানা যায়।
হোটেল-মোটেল মালিক ইলিয়াস সওদাগরসহ ব্যবসায়ীরা বলছেন, ২০২৫ সালের শীত মৌসুমে গড় কক্ষ দখল হার ছিল ৮৫ থেকে ৯৫ শতাংশ এবং ঈদ-পূজায় প্রায় পূর্ণ দখল (৯৮ শতাংশ) ছিল। তাঁদের মতে, নিরাপত্তা জোরদার হওয়ায় পরিবারভিত্তিক পর্যটক বেড়েছিল। তবে অসাধু দালালচক্র ও অতিরিক্ত দামের অভিযোগ পুরো শিল্পের সুনাম ক্ষুণ্ণ করছে বলে তাঁরা স্বীকার করেন। ব্যবসায়ীরা অনলাইন রেট মনিটরিং ও কেন্দ্রীয় মূল্যনির্ধারণ গাইডলাইন চালুর দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সাধারণ মানুষ পর্যটনকে কক্সবাজারের অর্থনীতির প্রাণ হিসেবে দেখেন। পর্যটক বাড়লে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ বাড়ে, এমন মত তাঁদের। তবে একই সঙ্গে তাঁরা সৈকতের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থায়ীভাবে দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন। তাঁদের মতে, কেবল পুলিশি টহল নয়, সমন্বিত প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাই টেকসই সমাধান দিতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মামলা ও অভিযানের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সক্রিয়তা প্রমাণিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। ডিজিটাল রুম ভাড়া নিয়ন্ত্রণ প্ল্যাটফর্ম, লাইসেন্সধারী গাইড ও পরিবহন নিবন্ধন ব্যবস্থা, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি সেল এবং ‘স্মার্ট ট্যুরিজম জোন’ ব্যবস্থাপনা চালু না হলে সমস্যার মূল উৎস পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসবে না।
কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে স্মার্ট টুরিজমকেই সময়ের দাবি হিসেবে দেখছেন কক্সবাজার টুরিস্ট পুলিশের রিজিয়ন প্রধান অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ। তাঁর মতে, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজারে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করলেই হবে না; প্রযুক্তিনির্ভর, তথ্যভিত্তিক ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পর্যটনকে আধুনিক কাঠামোয় নিয়ে যেতে হবে।
স্মার্ট সিসিটিভি নেটওয়ার্ক, রিয়েল-টাইম মনিটরিং, ডিজিটাল অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা, অনলাইন হোটেল রেট স্বচ্ছতা প্ল্যাটফর্ম এবং লাইসেন্সভিত্তিক গাইড-পরিবহন নিবন্ধন—এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করলে দালালমুক্ত, নিরাপদ ও স্বচ্ছ পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষায়, পর্যটকের নিরাপত্তা মানে শুধু অপরাধ দমন নয়; নিরাপদ অনুভূতি, সেবার স্বচ্ছতা ও পরিবেশ সুরক্ষা—সব মিলিয়েই স্মার্ট টুরিজম।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই কক্সবাজারকে ডিজিটাল ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন নগরীতে রূপ দিতে ধারাবাহিক নজরদারি ও নীতিগত সংস্কার অব্যাহত থাকবে।










