ঢাকা | মার্চ ৪, ২০২৬ - ১১:০৯ অপরাহ্ন

আদর্শিক ডিএনএ এবং পেন্টাগনের নাভিশ্বাস

  • আপডেট: Wednesday, March 4, 2026 - 9:40 pm

 

মো. মামুন হাসান।। ভূরাজনৈতিক দাবার বোর্ডে মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক সিঙ্গুলারিটি বা চূড়ান্ত বিন্দুতে উপনীত হয়েছে যেখানে প্রথাগত কূটনীতির ভাষা সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়েছে। ইরান ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই ত্রিমুখী সংঘাতকে কেবল একটি আঞ্চলিক লড়াই হিসেবে দেখলে বড় ভুল হবে। এটি মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী মার্কিন নেতৃত্বাধীন লিবেরাল ওয়ার্ল্ড অর্ডার এর কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার এক সুগভীব বৈশ্বিক ব্লুপ্রিন্ট।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রখ্যাত তাত্ত্বিক জন মিয়ারশেইমারের অফেন্সিভ রিয়ালিজম তত্ত্ব অনুযায়ী ইরান এখন তার অস্তিত্ব রক্ষায় সর্বোচ্চ আক্রমণাত্মক অবস্থানে চলে গেছে। আয়াতুল্লাহ খামেনি এবং ইরানের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের মৃত্যুতে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো স্ট্র্যাটেজিক ডিক্যাপিটেশন বা কৌশলগত শিরশ্ছেদ এর মাধ্যমে সাময়িক উল্লাস করলেও এটি আসলে ইরানকে আরও অনিয়ন্ত্রিত ও বিপজ্জনক এক স্টেট অ্যাক্টরে পরিণত করেছে। বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা অনুযায়ী নেতৃত্বের এই শূন্যতা ইরানকে প্রথাগত যুদ্ধের গণ্ডি ছাড়িয়ে এক ভয়াবহ শ্যাডো ওয়ার বা ছায়াযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে যেখানে যুদ্ধের ময়দান আর কোনো নির্দিষ্ট মানচিত্রে সীমাবদ্ধ নেই।

ইতিহাসের এক অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি আমরা বর্তমান সময়ে লক্ষ্য করছি। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব যখন সংঘটিত হয় তখন সিআইএ সমর্থিত শাহের সাভাক বাহিনী ছিল বিশ্বের অন্যতম নৃশংস ও শক্তিশালী ইন্টেলিজেন্স। কিন্তু সেই আধুনিক সমরাস্ত্রের দম্ভ ধূলিসাৎ হয়েছিল কোনো ড্রোন বা ব্যালিস্টিক মিসাইলে নয় বরং সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান করা ক্যাসেট টেপের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিপ্লবী আদর্শিক ভাইরাসের কাছে। বর্তমান সমরবিদরা এই ঘটনাকে মনস্তাত্ত্বিক প্যারালাইসিস হিসেবে অভিহিত করেন যেখানে অস্ত্র নয় বরং চিন্তাধারা বিজয়ী হয়। আজকের ইরান সেই একই উত্তরাধিকার বহন করছে যেখানে বোমা বর্ষণ করে আয়াতুল্লাহদের উৎখাত করা প্রায় অসম্ভব। ওয়াশিংটনের থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো এখন প্রকাশ্যে স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে যে গত কয়েক বছরে জো বাইডেন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প ইয়েমেনে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের বোমা ফেলেও যখন স্যান্ডেল পরা হুথিদের সরাতে পারেনি তখন এটি স্পষ্ট যে গ্রে জোন ওয়ারফেয়ারে পশ্চিমারা ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। ট্রাম্প সম্ভবত ২০২০ সালে সোলাইমানি হত্যার পর ইরানের সংযমকে দুর্বলতা ভেবেছিলেন কিন্তু সেটি ছিল তেহরানের স্ট্র্যাটেজিক পেশেন্স বা কৌশলগত ধৈর্য যা এখন এক ভয়ংকর প্রতিঘাতের রূপ নিয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে ইরান এখন পোস্ট লিডারশিপ যুগে প্রবেশ করেছে। এখানে কোনো একক ব্যক্তির মৃত্যু পুরো চেইন অফ কমান্ডকে ধ্বংস করতে পারে না কারণ তাদের সামরিক কাঠামো এখন রাইজোমেটিক বা শৃঙ্খলহীনভাবে বিস্তৃত।

ইসরায়েলের মোসাদ হয়তো শীর্ষ ব্যক্তিদের নিখুঁত নিশানায় হত্যা করতে পারছে কিন্তু তারা লড়ছে এমন এক শ্যাডো আর্মির বিরুদ্ধে যাদের কোনো সুনির্দিষ্ট কেন্দ্র বা হেডকোয়ার্টার নেই। লেবাননের হিজবুল্লাহর দেড় লক্ষাধিক মিসাইলের মজুদ থেকে শুরু করে ইরাক ও সিরিয়ার শিয়া মিলিশিয়াদের সমন্বয়ে ইরান এক অনন্য মাল্টি ফ্রন্ট ওয়ার ডকট্রিন তৈরি করেছে। রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোন যেভাবে যুদ্ধের মানচিত্র বদলে দিয়েছে তা মধ্যপ্রাচ্যেও এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। মস্কো এখন ইরানকে এস ৪০০ মিসাইল সিস্টেম এবং সু ৩৫ যুদ্ধবিমান দিয়ে এক দুর্ভেদ্য আকাশ প্রতিরক্ষা বলয় তৈরির সুযোগ করে দিচ্ছে যা ইসরায়েলের একচ্ছত্র এয়ার সুপিরিওরিটি বা আকাশ আধিপত্যের জন্য যমদূত হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীন এবং রাশিয়ার এই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন ইরানকে এক ধরণের ইমিউনিটি বা সুরক্ষা কবজ প্রদান করেছে। বিশেষ করে ইরানের জ্বালানি বাণিজ্যে পেট্রো ইউয়ানের প্রবেশ মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক রিজার্ভ কারেন্সি স্ট্যাটাসকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

এই সংঘাতের সবচেয়ে মরণঘাতী চালটি ইরান দিয়েছে সমুদ্রপথে যা এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এক মরণফাঁদ। হার্টল্যান্ড থিওরির আধুনিক প্রয়োগ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর একচ্ছত্র সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। এটি কোনো সাধারণ নৌ অবরোধ নয় এটি মূলত বিশ্ব অর্থনীতির ক্যারোটিড আর্টারি বা প্রধান ধমনী চেপে ধরা। হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক পঞ্চমাংশ পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবাহিত হয়। ইরানের শক্তিশালী নৌবাহিনী এবং আইআরজিসি এর অত্যাধুনিক ড্রোন সমৃদ্ধ স্পিডবোটগুলো এই জলপথকে এখন একটি ডেথ ট্র্যাপে পরিণত করেছে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে বীমা প্রিমিয়াম আকাশচুম্বী হয়েছে। ইরান যখন তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সরাসরি হুমকি দেয় তখন সেটি কেবল ফাঁকা বুলি থাকে না কারণ এটি পশ্চিমা বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য এক পকেট ধ্বংসকারী ইনফ্লেশনারি বোম্ব। তেলের আকাশচুম্বী দাম মানে উন্নত দেশগুলোতে ভয়াবহ সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হওয়া যা শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা গণতন্ত্রের ভিত্তি নাড়িয়ে দিতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিস্থিতি এখন আর কোনো সাধারণ যুদ্ধ নয় এটি একটি চূড়ান্ত এন্ডগেম। সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো এখন এক অদ্ভুত নীরবতা পালন করছে কারণ তারা জানে যে আমেরিকার নিরাপত্তা ছাতা এখন ফুটো হয়ে গেছে। তাদের বিলিয়ন ডলারের মেগা প্রজেক্ট এবং কাঁচের শহরগুলো এখন ইরানের নিখুঁত ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং সুইসাইড ড্রোনের আওতাধীন। সুতরাং তারা সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে নামার চেয়ে নিউট্রাল হেজিং বা কৌশলগত নিরপেক্ষতার পথ বেছে নিয়েছে যা ওয়াশিংটনের জন্য বড় এক ধাক্কা। নেতৃত্বের মৃত্যু হয়তো হয়েছে কিন্তু যে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধের আদর্শ মধ্যপ্রাচ্যের বালিতে মিশে আছে তা উপড়ে ফেলার কোনো ব্লুপ্রিন্ট পেন্টাগন বা মোসাদের কাছে নেই। যুদ্ধ মানে এখন কেবল রক্তপাত নয় বরং বিশ্ব অর্থনীতির এক অনিশ্চিত অতল গহ্বরে ঝাঁপ দেওয়া। এই আগ্নেয়গিরির উদগিরণ কেবল তখনই থামতে পারে যদি বিশ্বশক্তিগুলো সামরিক আস্ফালন ছেড়ে এক নতুন আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং একটি মাল্টি পোলার বা বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থাকে মেনে নেয়।

লেখক: শিক্ষক ও কলাম লেখক