ঢাকা | ফেব্রুয়ারী ১, ২০২৬ - ১:০৯ অপরাহ্ন

যশোরের পর্যটনে কিউকেনহফ বিপ্লবের হাতছানি

  • আপডেট: Sunday, February 1, 2026 - 5:58 am

মো. মামুন হাসান।। যশোর বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার যশোর কেবল একটি প্রাচীন জনপদ নয়; বরং এটি হাজার বছরের ঐতিহ্য ও আধুনিক কৃষি বিপ্লবের এক অনন্য মেলবন্ধন। যশোরের ঝিকরগাছার গদখালী আজ দেশের ‘ফুলের রাজধানী’ হিসেবে স্বীকৃত। তবে এই অপার সম্ভাবনাকে কেবল মৌসুমি পর্যটনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একে একটি বিশ্বমানের টেকসই পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তোলার সময় এসেছে। বর্তমান সময়ের বৈশ্বিক পর্যটন শিল্পের সাথে সংগতি রেখে যশোরের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী এবং উদ্ভাবনী মহাপরিকল্পনা।

 

গদখালী: ‘অ্যাগ্রো-ট্যুরিজম’ ও স্মার্ট ভিলেজের রূপরেখা

গদখালীকে ঘিরে পর্যটন কেবল ছবি তোলা বা ঘুরে দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। একে একটি ‘লিভিং মিউজিয়াম’ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত কিউকেনহফ (Keukenhof) গার্ডেনের আদলে গদখালীকে সাজাতে নিচের পদক্ষেপগুলো বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে:

ফ্লাওয়ার মিউজিয়াম ও সিড ব্যাংক: দেশি-বিদেশি ফুলের ইতিহাস ও বিবর্তন তুলে ধরতে একটি অত্যাধুনিক মিউজিয়াম স্থাপন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি একটি ‘সিড ব্যাংক’ থাকবে যেখান থেকে পর্যটকরা বিরল প্রজাতির ফুলের বীজ বা চারা সংগ্রহ করতে পারবেন।

নাইট ট্যুরিজম ও লাইট শো: ডাচ টিউলিপ গার্ডেনের মতো সোলার এনার্জি ব্যবহার করে রাতেও পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও নান্দনিক পরিবেশ তৈরি করা যেতে পারে।
স্মার্ট কিউআর কোডিং: প্রতিটি বাগানের সামনে কিউআর কোড থাকবে। পর্যটকরা ফোনে স্ক্যান করলেই অডিওর মাধ্যমে ওই ফুলের জাত, চাষের ইতিহাস এবং স্থানীয় কৃষকের সংগ্রামী গল্প শুনতে পাবেন।

কিউরেটেড ফ্লাওয়ার ট্রেইল: ফুলের ক্ষতি এড়াতে মাঠের ওপর দিয়ে কাঠের পাটাতনের উঁচু ‘ওয়াকিং ট্রেইল’ তৈরি করতে হবে, যাতে সৌন্দর্য উপভোগও হবে আবার প্রকৃতিও রক্ষা পাবে।

রেলপথে সংযোগ: ‘ফ্লাওয়ার ভ্যালি এক্সপ্রেস’

যাতায়াত সহজ করতে রেলপথই হতে পারে প্রধান মাধ্যম। গদখালীতে ট্রেনের নিয়মিত স্টপেজ নিশ্চিত করে স্টেশনটিকে একটি ‘থিমড স্টেশন’ হিসেবে সাজানো এখন সময়ের দাবি। স্টেশনের দেয়ালে ফুলের আল্পনা এবং প্রবেশপথে ফুলের সুবাস পর্যটকদের শুরুতেই এক মায়াবী আবেশ দেবে। পর্যটন মৌসুমে খুলনা ও যশোর থেকে বিশেষ ‘শাটল রেল কার’ চালু করলে সড়কপথের ওপর চাপ কমবে এবং ভ্রমণ হবে আনন্দদায়ক।

 

খেজুরের রস ও গুড়: শীতকালীন এক অনন্য আকর্ষণ

যশোরের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো খেজুরের রস। ‘রুরাল এক্সপেরিয়েন্স ট্যুরিজম’-এর অংশ হিসেবে পর্যটকদের জন্য সরাসরি গাছির গাছ কাটা দেখা, মাঠের একপাশে নান্দনিক পরিবেশে বসে টাটকা রস পান এবং মাটির চুলায় গুড় তৈরির প্রক্রিয়া সচক্ষে দেখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এটি বিদেশি পর্যটকদের কাছে আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতিকে তুলে ধরার বড় হাতিয়ার হবে।

 

যশোর রোড ও কপোতাক্ষ: ঐতিহ্যের গ্যালারি ও রিভারসাইড ইকোনমি

যশোর রোডের শতবর্ষী রেইনট্রি গাছগুলোকে সংরক্ষণের পাশাপাশি রাস্তার দুই পাশে সাইক্লিং ট্র্যাক নির্মাণ করা যেতে পারে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্বলিত ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপন করে একে একটি ‘ওপেন এয়ার গ্যালারি’তে রূপান্তর করা সম্ভব।

অন্যদিকে, মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত কপোতাক্ষ নদের নাব্যতা ফিরিয়ে এনে শুরু করা যেতে পারে ‘ওয়াটার ট্যুরিজম’। নদীর বুকে ভাসমান রেস্টুরেন্ট এবং তীরে ‘কবিতার ঘাট’ নির্মাণ করা যেতে পারে, যেখানে মহাকবির অমর পঙ্‌ক্তিমালা খোদাই করা থাকবে।

 

টেকসই উন্নয়ন ও স্থানীয় অংশগ্রহণ

পর্যটন শিল্পের প্রকৃত সুফল পেতে হলে স্থানীয় তরুণদের ‘পর্যটন বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় এই অঞ্চলকে ‘প্লাস্টিকমুক্ত জোন’ ঘোষণা করা জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদের বাড়িতে ‘হোমস্টে’ সুবিধা চালু করলে পর্যটকরা সরাসরি গ্রামীণ জীবন উপভোগ করতে পারবেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে মজবুত করবে।

যশোরের এই অমিত সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকেও উৎসাহিত করতে হবে। রেলপথের আধুনিকায়ন, কপোতাক্ষের নাব্যতা এবং গদখালীর সুবাস যদি একসূত্রে গাঁথা যায়, তবে যশোর হবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা পর্যটন গন্তব্য।

লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক)ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।