প্রচ্ছদ » ভূ-রাজনীতির দাবানল ও বাংলাদেশের পর্যটন: রিজার্ভ সংকটে এক রপ্তানিহীন বিপ্লব - দৈনিক জাগো জনতা
ভূ-রাজনীতির দাবানল ও বাংলাদেশের পর্যটন: রিজার্ভ সংকটে এক রপ্তানিহীন বিপ্লব
- আপডেট: Friday, February 6, 2026 - 7:00 pm
বৈশ্বিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে আমাদের প্রথাগত রপ্তানি খাতগুলো যখন বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য নীতির ওপর নির্ভরশীল, তখন পর্যটন হতে পারে আমাদের একমাত্র স্বাধীন ও সার্বভৌম অর্থনৈতিক হাতিয়ার। কারণ, পর্যটন হলো এমন এক অদৃশ্য রপ্তানি, যার জন্য আমাদের কোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির মুখাপেক্ষী হতে হয় না, বরং পর্যটক নিজেই সরাসরি ডলার নিয়ে আমাদের দোরগোড়ায় হাজির হন।
বাস্তবতা হলো, পণ্য রপ্তানিতে আয়ের বড় অংশই কাঁচামাল ও উপকরণ আমদানিতে ব্যয় হয়ে যায়, ফলে বৈদেশিক মুদ্রার কেবল সামান্য অংশই রিজার্ভে যোগ হয়। কিন্তু পর্যটনের ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন বিদেশি পর্যটকের ব্যয় করা সমগ্র অর্থ সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে প্রবেশ করে।থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনাম আজ কেবল পর্যটনের ওপর ভিত্তি করে তাদের রিজার্ভকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছে, তা ভূ-রাজনৈতিক সংকটেও তাদের অর্থনীতিকে ধসে পড়তে দেয়নি। বাংলাদেশের ৫৬ হাজার বর্গমাইলজুড়ে যে বৈচিত্র্য, তা কেবল প্রকৃতি নয়, তা মূলত একেকটি আনট্যাপড ডলার রিজার্ভার। বিদেশি পর্যটক বাড়াতে আমাদের সস্তা চটকদার বিজ্ঞাপনের বাইরে এসে ভ্যালু-বেজড পর্যটনে বিনিয়োগ করতে হবে।
পাঁচতারা হোটেলের কাঁচঘেরা কৃত্রিমতা নয়, বিশ্ব এখন খুঁজছে মাটির ঘ্রাণ আর জীবনের আদিম স্পন্দন। বাংলাদেশের পর্যটন মানে এখন আর কেবল দূর থেকে পাহাড় দেখা নয়, বরং সুন্দরবনের গহিন উপকূলে একজন বনজীবীর মাটির দাওয়ায় বসে জ্যান্ত মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাওয়ার সেই অকৃত্রিম আতিথ্য। যখন মাঝরাতে বনের কিনারে বাঘের গম্ভীর গর্জন বুকের ভেতরটা কাঁপিয়ে দেয় কিংবা হাওরের নীল জলরাশিতে ভাসমান নৌকায় বসে রূপালি জোছনা গায়ে মাখা যায়, তখনই তৈরি হয় সেই ‘র রিয়েলিটি’ যা পৃথিবীর কোনো বিলাসবহুল রিসোর্টে কেনা সম্ভব নয়। এই আদিম ও অকৃত্রিম অভিজ্ঞতাই হতে পারে আমাদের গ্লোবাল ব্র্যান্ডিংয়ের সবচেয়ে দামী পণ্য।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার এই সময়ে আমাদের তরুণদের সামনে খুলে যেতে পারে ক্রাইসিস-প্রুফ পেশার এক নতুন দুয়ার। ইউরোপ-আমেরিকায় জীবনযাত্রার ব্যয় যখন আকাশচুম্বী, তখন বান্দরবানের মেঘের ওপর বা সাজেকের নির্জন বাঁশের মাচায় হাই-স্পিড ইন্টারনেট পৌঁছে দিয়ে আমরা আমন্ত্রণ জানাতে পারি হাজারো ডিজিটাল যাযাবরদের। পাহাড়ের চূড়ায় বসে ল্যাপটপে কাজ করতে করতে একজন বিদেশি ফ্রিল্যান্সার যখন স্থানীয় কফির কাপে চুমুক দেবেন, তখন কেবল আমাদের রিজার্ভই সমৃদ্ধ হবে না, বরং আমাদের লোকজ সংস্কৃতিও বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নেবে। পর্যটন এখানে আর শুধু ঘোরাঘুরি নয়, এটি হয়ে উঠবে একটি দীর্ঘমেয়াদী ওয়ার্কেশন হাব।
ভবিষ্যতের এই যাত্রায় আমাদের সারথি হবে কার্বন-ফুটপ্রিন্ট গাইড এর মতো উদ্ভাবনী সব কারিগর। যারা পরিবেশ সচেতন পর্যটকদের কেবল পথ দেখাবেন না, বরং তাদের দিয়ে রোপণ করাবেন ম্যানগ্রোভের চারা বা হিজল-করচের বন। একজন পর্যটক যখন জানবেন তার ভ্রমণের বিনিময়ে প্রকৃতিতে একটি সবুজ প্রাণ যোগ হচ্ছে, তখন সেই ভ্রমণ হয়ে উঠবে পরম সার্থক। বাংলাদেশের এই বিশাল জলবায়ু এবং প্রাণবৈচিত্র্যকে কেন্দ্র করে আমরা যদি এমন টেকসই ও জীবন্ত অভিজ্ঞতার ডালি সাজাতে পারি, তবে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং যুদ্ধে বাংলাদেশ হবে অপ্রতিরোধ্য এক নাম।
তবে এই যুদ্ধে জয়ী হতে হলে দেশের পর্যটন খাতকে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করা একান্ত জরুরি এবং এর জন্য সাহসী ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। বিদেশি পর্যটকদের জন্য অন-অ্যারাইভাল ভিসা প্রক্রিয়া সহজতর করা, প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার করা বর্তমান সময়ের দাবি। বাংলাদেশের পর্যটনকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে আমাদের দূতাবাসগুলোকে ব্র্যান্ডিং হাব-এ রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের প্রতিটি মিশন যদি সক্রিয়ভাবে দেশের রূপ-বৈচিত্র্য তুলে ধরে এবং সেই সাথে বিশ্বখ্যাত পর্যটন ব্লগার ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আতিথেয়তা প্রদান করা হয়, তবেই বিশ্বমানচিত্রে আমাদের অবস্থান দৃঢ় হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বার্তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ ও আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা অপরিহার্য। এই সমন্বিত উদ্যোগই পারে চ্যালেঞ্জ জয় করে বাংলাদেশের পর্যটনকে নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিতে।
সরকারকে বুঝতে হবে, পর্যটন খাতে ১ ডলার বিনিয়োগ করলে তার রিটার্ন আসে বহুগুণ। সরকারের উচিত পর্যটনকে শিল্প হিসেবে পূর্ণ স্বীকৃতি দিয়ে টেক্সটাইল খাতের মতো বিশেষ প্রণোদনা এবং ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের গ্রাজুয়েটদের জন্য সহজ শর্তে বড় অঙ্কের স্টার্টআপ লোন প্রদান করা।
একইসাথে জনগণের মানসিকতায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা জরুরি। পর্যটককে কেবল অতিথি নয়, দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে দেখতে হবে। পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের সাথে ব্যবসায়িক সততা বজায় রাখা প্রতিটি নাগরিকের দেশপ্রেমের অংশ হওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, একটি পর্যটন কেন্দ্র যখন গড়ে ওঠে, তখন কেবল একটি রিসোর্ট হয় না, বরং ওই এলাকার জেলের জাল থেকে শুরু করে কুমোরের হাঁড়ি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে অর্থের প্রবাহ সচল হয়।
পরিশেষে, ভূ-রাজনীতির এই দাবার চালে বাংলাদেশ যদি নিজেকে একটি নিরাপদ ও অকৃত্রিম পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রমাণ করতে পারে, তবে বৈদেশিক মুদ্রার জন্য আমাদের আর কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার শর্তের কাছে মাথা নত করতে হবে না। প্রকৃতির শাশ্বত সৌন্দর্য আর তারুণ্যের উদ্ভাবনী মেধা যখন স্মার্ট ট্যুরিজমের এক মোহনায় মিলবে, তখন বাংলাদেশের পর্যটন চিত্রটিই বদলে যাবে। সুন্দরবনের নিভৃত শ্বাসমূল থেকে শুরু করে কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ বালুকারাশি কিংবা সেন্ট মার্টিনের নীল জলরাশির প্রতিটি প্রবাল হয়ে উঠবে আমাদের অর্থনীতির অমূল্য সম্পদ একেকটি মুদ্রার খনি। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যবস্থাপনা আর প্রাকৃতিক সম্পদের এই মেলবন্ধনেই গড়ে উঠবে আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশ, যেখানে পর্যটন খাত কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।











