ঢাকা | জুন ১৯, ২০২৬ - ৬:৩১ অপরাহ্ন

শিরোনাম

ট্যুরিজম মেগা প্ল্যান ২০২৬ থেকে ২০৪০: টেকসই অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের নতুন ইঞ্জিন

  • আপডেট: Friday, June 19, 2026 - 2:42 pm

মো. মামুন হাসান।। বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার গল্প লিখতে গেলে এতদিন তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি, রেমিট্যান্স কিংবা তথ্যপ্রযুক্তির কথা বেশি উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর অভিজ্ঞতা বলছে, যে দেশ তার সংস্কৃতি, প্রকৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষের জীবনধারাকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করতে পেরেছে, সেই দেশই পর্যটন অর্থনীতিতে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশ এখন সেই নতুন যাত্রার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে।

সরকারের প্রণয়নাধীন ট্যুরিজম মেগা প্ল্যান ২০২৬ থেকে ২০৪০ সেই যাত্রারই একটি উচ্চাভিলাষী রূপরেখা। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৪০ সালের মধ্যে ৫ কোটি ৫৭ লাখ পর্যটক আকর্ষণ এবং ২ কোটি ১৯ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি এই লক্ষ্য অর্জিত হয়, তাহলে পর্যটন শুধু একটি শিল্প নয়, বরং দেশের অন্যতম বৃহৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বছরে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার। সংখ্যাটি বৈশ্বিক মানদণ্ডে এখনও সীমিত। অথচ বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, পাহাড়ি অঞ্চল, চা বাগান, নদীমাতৃক গ্রামীণ জীবন, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং শত শত বছরের লোকসংস্কৃতি মিলিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৈচিত্র্যময় পর্যটন গন্তব্য হওয়ার সক্ষমতা রাখে।

বিশ্ব পর্যটনের প্রবণতাও বাংলাদেশের জন্য আশাব্যঞ্জক। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা ৩০ কোটির বেশি হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব ভ্রমণ, নীরব পর্যটন, গ্রামীণ অভিজ্ঞতা, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং কমিউনিটি ভিত্তিক পর্যটনের প্রতি মানুষের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। এই পরিবর্তিত চাহিদা বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে।

তবে এই মেগা প্ল্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়; বরং পর্যটনকে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেমে রূপান্তর করা। একজন পর্যটক যখন একটি অঞ্চলে যান, তখন শুধু হোটেল নয়, স্থানীয় কৃষক, জেলে, পরিবহন শ্রমিক, হস্তশিল্পী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং নারী উদ্যোক্তাদের কাছেও অর্থ পৌঁছে যায়। বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের বিভিন্ন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পর্যটনে ব্যয় হওয়া প্রতিটি টাকার বহুগুণ অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রবাহিত হয়।

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা গ্রামীণ অভিজ্ঞতা অর্থনীতিতে। ভবিষ্যতের পর্যটক শুধু দর্শনীয় স্থান দেখতে চান না; তারা স্থানীয় মানুষের জীবনকে অনুভব করতে চান। সাতক্ষীরার গ্রামে মাটির বাড়িতে রাতযাপন, সুন্দরবনের প্রান্তিক জনপদের জীবনের গল্প শোনা, সিলেটের চা বাগানে চা পাতা সংগ্রহের অভিজ্ঞতা, চরাঞ্চলে কৃষিকাজে অংশগ্রহণ কিংবা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি জানা আজকের পর্যটনের নতুন চাহিদা।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশে “এক গ্রাম এক অভিজ্ঞতা” কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। যেখানে প্রতিটি পর্যটন গ্রাম একটি স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতা বিক্রি করবে। কোনো গ্রাম কৃষিভিত্তিক অভিজ্ঞতা, কোনো গ্রাম নদীভিত্তিক জীবন, কোনো গ্রাম লোকসংস্কৃতি, আবার কোনো গ্রাম হস্তশিল্পকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে। এতে উন্নয়নের সুবিধা রাজধানী বা বড় শহরে সীমাবদ্ধ না থেকে সরাসরি গ্রামের মানুষের ঘরে পৌঁছাবে।

আরেকটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হতে পারে “হোমস্টে বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক”। বিশ্বের বহু দেশে পর্যটনের বড় অংশ এখন স্থানীয় পরিবারের সঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় যদি মানসম্মত ও নিবন্ধিত হোমস্টে নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, তাহলে হাজার হাজার পরিবার নতুন আয়ের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে বিদেশি পর্যটকরা বাংলাদেশের প্রকৃত জীবনধারা সম্পর্কে ধারণা লাভ করবেন।

পর্যটনের ভবিষ্যৎ এখন ডিজিটাল। তাই একটি সমন্বিত “স্মার্ট বাংলাদেশ ট্যুরিজম প্ল্যাটফর্ম” তৈরি করা জরুরি। যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভ্রমণ পরিকল্পনা, অনলাইন বুকিং, ডিজিটাল গাইড, ভার্চুয়াল ট্যুর, নিরাপত্তা তথ্য এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সেবা একই প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে। এতে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।

পর্যটনকে কেন্দ্র করে সৃজনশীল অর্থনীতিও বিকশিত হতে পারে। চলচ্চিত্র পর্যটন, খাদ্য পর্যটন, উৎসব পর্যটন, সাহিত্য পর্যটন, মুক্তিযুদ্ধ পর্যটন এবং নদী পর্যটনের মতো বিশেষায়িত খাতগুলো আগামী দশকে নতুন বাজার সৃষ্টি করতে পারে। একটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র বা ওয়েব সিরিজ অনেক সময় একটি অঞ্চলকে বিশ্বব্যাপী পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশও এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।

সরকার ইতোমধ্যে পর্যটন ও বিমান চলাচল খাতে ১ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছে। যশোর, সৈয়দপুর, কক্সবাজার, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের উন্নয়ন, তৃতীয় টার্মিনালের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক গেটওয়ে সম্প্রসারণ দেশের পর্যটন মানচিত্রকে নতুন মাত্রা দেবে। একই সঙ্গে জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ৬ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে অবকাঠামোই শেষ কথা নয়। পর্যটনের মূল শক্তি হলো মানুষের আচরণ, সেবার মান এবং অভিজ্ঞতার গুণগত উৎকর্ষ। তাই পর্যটন শিক্ষায় বিনিয়োগ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, ভাষা শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক মানের আতিথেয়তা সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশ্বের অনেক দেশ প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে অভিজ্ঞতা বিক্রি করে বেশি আয় করছে। বাংলাদেশের সামনে এখন সেই একই সুযোগ। আমাদের নদী, বন, সমুদ্র, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের আন্তরিকতা যদি সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরিত করা যায়, তাহলে ট্যুরিজম মেগা প্ল্যান ২০২৬ থেকে ২০৪০ শুধু একটি সরকারি পরিকল্পনা হয়ে থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে বাংলাদেশের টেকসই অর্থনীতি, গ্রামীণ পুনর্জাগরণ এবং কর্মসংস্থানের নতুন বিপ্লবের ভিত্তিপ্রস্তর।

পর্যটনের ভবিষ্যৎ আসলে শুধু ভ্রমণের ভবিষ্যৎ নয়। এটি নতুন আয়ের ভবিষ্যৎ, নতুন কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ, নতুন বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ এবং সবচেয়ে বড় কথা বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে বিশ্বের সামনে নতুনভাবে তুলে ধরার ভবিষ্যৎ।

লেখক- মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর(টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।